
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ উপকূলীয় ইউনিয়ন উত্তর বেদকাশী। সুপেয় পানির সংকট আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করা এই ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন না হলেও, ভাগ্য বদলেছে ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোঃ নূরুল ইসলাম সরদারের। অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বৈরাচারী রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ও নিজস্ব ‘পেটুয়া বাহিনী’র জোরে পুরো ইউনিয়নকে এক প্রকার জিম্মি করে রেখেছেন শিক্ষাগত যোগ্যতাহীন এই জনপ্রতিনিধি। সরকারি ত্রাণ আত্মসাৎ, ভুয়া বিসিএস ক্যাডার ও জজ পরিচয়ধারী এক কুখ্যাত প্রতারককে প্রকাশ্য আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া এবং অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে একচ্ছত্র ক্ষমতার বলয় তৈরি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানের মূল সূত্রপাত কাটমাছচর (বেদকাশী) গ্রামের বছির সরদারের ছেলে শাহিনুর সরদারকে কেন্দ্র করে। এলাকায় সে চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম সরদারের ডানহাত এবং পেটুয়া বাহিনীর প্রধান হিসেবে পরিচিত।
শাহিনুর বিবাহিত এবং তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তবে এই পারিবারিক পরিচয় গোপন করে সে নিজেকে বিসিএস ক্যাডার, জজ এবং কখনো ব্যারিস্টার পরিচয় দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সরল ও অসহায় মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে। এরপর ভুয়া বা নকল কাবিননামা তৈরি করে বিয়ে করে এবং পরবর্তী সময়ে নারীদের সংবেদনশীল ছবি ও তথ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল ও লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়।
শাহিনুরের জালিয়াতির জাল কতটা গভীর, তা প্রকাশ পায় তার ব্যবহৃত একটি মোবাইল নম্বরের (০১৯৬৮৯১৩৩০০) সূত্র ধরে। একের পর এক প্রতারণার শিকার নারীদের একজন সন্দেহবশত প্রশাসনের একটি বিশেষ গোয়েন্দা টিমের সহায়তায় এই নম্বরের নিবন্ধন (Biometric Registration) যাচাই করেন।
সেখানে দেখা যায়, সিমটি শাহিনুরের নিজের নামে নয়। এটি গাজীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নেশার আলী গাইনের ছেলে মোহাম্মদ ইলিয়াস কাঞ্চন গাইনের (৩৯) নামে নিবন্ধিত। এলাকায় ইলিয়াস কাঞ্চন একজন অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ হিসেবে পরিচিত। তার এই সরলতার সুযোগ নিয়ে বা তার অজান্তেই জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার করে সিমটি তুলে নেয় শাহিনুর। দীর্ঘদিন ধরে এই সিম ব্যবহার করেই সে বিভিন্ন স্থানে ফোন দিয়ে হুমকি, ব্লাকমেইল এবং মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল, যাতে অপরাধ করলেও দায় পড়ে নিরীহ ইলিয়াসের ওপর।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ টিম যখন শাহিনুরের খোঁজে এলাকায় তদন্ত শুরু করে, তখন স্থানীয় সংবাদকর্মীরা উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম সরদারের মুখোমুখি হন। সে সময় সাংবাদিকদের কাছে দায় এড়াতে চেয়ারম্যান সাধু সাজার নাটক করেন। তিনি ক্যামেরার সামনে বলেন,
“শাহিনুর ইসলাম একটা আস্ত বাটপার এবং বড় প্রতারক। ওর বিচার আমি নিজেই করব। ভুক্তভোগীদের আপনারা আমার কাছে, ইউনিয়ন পরিষদে পাঠিয়ে দেন।”
কিন্তু এর পরের ঘটনাই প্রমাণ করে চেয়ারম্যান নিজেই এই চক্রের মূল হোতা। সাংবাদিকদের সহায়তায় ভুক্তভোগী নারীরা যখন আইনি ও সামাজিক বিচার পাওয়ার আশায় উত্তর বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদে যান, তখন চেয়ারম্যান তাদের কোনো পাত্তাই দেননি। উল্টো ছলে-বলে-কৌশলে এবং বিভিন্ন অজুহাতে তিনি পরিষদ থেকে সটকে পড়েন। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জানা যায়, পরিষদ থেকে বের হয়েই চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম সরদার মুঠোফোনের মাধ্যমে শাহিনুরকে সতর্ক করে দেন এবং তাকে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে এলাকা থেকে সরিয়ে দেন।
উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নটি সুন্দরবন সংলগ্ন হওয়ায় এখানকার সিংহভাগ মানুষ নদী ও বনের ওপর নির্ভরশীল। সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলে ও বাউলিদের (মধু সংগ্রহকারী) জন্য প্রতি বছর যে বিশেষ চাল এবং আর্থিক সহায়তা আসে, তা নিয়ে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে রয়েছে পাহাড়সম ক্ষোভ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তালিকায় নাম না রেখে চেয়ারম্যান তার নিজস্ব অনুসারী এবং বিত্তবানদের নাম ঢুকিয়েছেন। এছাড়া বরাদ্দের চালের বড় একটি অংশ প্রতিবারই কালোবাজারে বিক্রি করে আত্মসাৎ করা হয় এবং সাধারণ মানুষের মাঝে তা সঠিকভাবে বণ্টন করা হয় না। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেউ জেলা বা উপজেলা প্রশাসনে লিখিত অভিযোগ দিতে চাইলে তার ওপর নেমে আসে চেয়ারম্যানের পেটুয়া বাহিনীর নির্যাতন।
ইউনিয়নে চেয়ারম্যানের একক রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে শাহিনুর সরদারের নেতৃত্বে একটি লাঠিয়াল ও পেটুয়া বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এই বাহিনীর কাজ হলো—চেয়ারম্যানের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে তাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো, সামাজিক ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা এবং এলাকা ছাড়া করা। বিচারের নামে দিনের পর দিন মানুষকে ঘুরিয়ে শেষে কিছু না করে উল্টো ভুক্তভোগীকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়ার অসংখ্য নজির রয়েছে এই পরিষদে।
অনুসন্ধানকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বয়োবৃদ্ধা নারী কান্নায় ভেঙে পড়ে এই প্রতিবেদককে বলেন
“আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি। এই চেয়ারম্যান আর তার চালবাজ শাহিনুর সরদার মিলে আমার ছেলের নামে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিছে। পুলিশ আর চেয়ারম্যানের পেটুয়া বাহিনীর ভয়ে বাড়ি ছাড়তে ছাড়তে আজ আমার ছেলে ঘরছাড়া। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে না পেরে আমার সোনা ছেলে আজ সুন্দরবনের জলদস্যু বাহিনীতে নাম লেখাতে বাধ্য হইছে! আমি এই জুলুমবাজ চেয়ারম্যান আর বাটপার শাহিনুরের বিচার চাই।”
এই ঘটনার পর থেকে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম সরদার ও তার সহযোগী শাহিনুরের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠছে সাধারণ মানুষ।
এ বিষয়ে জানার জন্য কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) এবং জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে জালিয়াতি চক্রকে আশ্রয় দেওয়া এবং সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। মোবাইল সিম জালিয়াতি এবং নারীদের ব্ল্যাকমেইলের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশের বিশেষ শাখা। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।