
মোঃ মেহেদী হাসান, সম্পাদক ও প্রকাশক
জীবিকার তাগিদে বিগত ৪ থেকে ১০ বছর আগে তীব্র অভাবের তাড়নায় সীমান্ত পাড়ি দেওয়া অসহায় বাংলাদেশি নাগরিকেরা বর্তমানে এক অভূতপূর্ব ও নারকীয় যন্ত্রণায় রূপ নিয়েছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও উগ্রপন্থী দলগুলোর নানামুখী নির্যাতন, মুসলিম নিপীড়ন এবং প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে সেখানে অবস্থান করা সাধারণ শ্রমিকেরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত চৌকির ওপারে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার অসহায় বাংলাদেশি নাগরিক জীবন বাঁচাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর কাছে আত্মসমর্পণ করে সসম্মানে স্বদেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বাইরে গিয়ে হঠাৎ এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে পুশব্যাক করার কারণে বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশের মুখে তৈরি হয়েছে এক জটিল পরিস্থিতি। দেশের সীমানায় পা রাখতেই এই নিঃস্ব মানুষদের পোহাতে হচ্ছে চরম হয়রানি, আইনি জটিলতা এবং একশ্রেণীর নিষ্ঠুর দালাল সিন্ডিকেটের অমানবিক লুণ্ঠন।
জাতীয় পত্রিকার শৈলীতে তৈরি এই বিশেষ প্রতিবেদনে হাকিমপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত সংকটের সেই নির্মম বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হলো।
সীমান্তবর্তী নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং ভুক্তভোগীদের স্বজনদের কাছ থেকে জানা গেছে, ভারতের বিভিন্ন কর্মস্থল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া এবং উচ্ছেদের শিকার হওয়া ৪-৫ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক এখন হাকিমপুরসহ বিভিন্ন সীমান্তের ওপারে খোলা আকাশের নিচে বুকভরা আশা নিয়ে বসে আছেন নিজ দেশে ঢোকার জন্য।
তীব্র তাপদাহ ও ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কোনো প্রকার খাবার ও বিশুদ্ধ পানি ছাড়া শিশু, বৃদ্ধ এবং নারীরা চার থেকে পাঁচ দিন ধরে সম্পূর্ণ খেয়ে না খেয়ে বর্ডার লাইনে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। অভুক্ত শিশুদের কান্না আর অসুস্থ বৃদ্ধদের আহাজারিতে সীমান্তের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।
খোলা আকাশের নিচে কোনো নিরাপদ আশ্রয় বা শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় শত শত মা-বোন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও লজ্জাজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। দীর্ঘ পথ চলা এবং দিনের পর দিন অনাহারে থাকার কারণে অনেক শিশু ও বৃদ্ধ মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
বিএসএফ যখন এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক আইন ও আইনি জটিলতার কারণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) যথাযথ পরিচয় নিশ্চিত না করে তাদের দেশে প্রবেশে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আর এই সুযোগে নিজ ভূমিতে পা রাখতেই সাধারণ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে অন্তহীন ঝামেলা।
অভিযোগ উঠেছে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর কতিপয় সদস্য পরিচয় নিশ্চিত করার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার নামে এই ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত মানুষদের দেশের সীমান্তে প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখছেন। বিশেষ করে রাতের আঁধারে যখন বাংলাদেশিরা সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন বিজিবির কতিপয় সদস্যের হাতে তারা নানান ধরনের হয়রানি ও বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন।
এই সংকটের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়টি রচনা করছে সীমান্তে সক্রিয় একশ্রেণীর অসাধু দালাল সিন্ডিকেট। রাতের আঁধারে সীমান্ত পার করার নাম করে বা আইনি ঝামেলা এড়ানোর কথা বলে এই দালাল চক্র অসহায় মানুষদের জিম্মি করছে। এই অনাহারী ও অসহায় মানুষদের ধরে তাদের কাছে থাকা শেষ সম্বল—নগদ টাকা-পয়সা, উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম মোবাইল ফোন এবং নারীদের পরিধেয় সামান্য অলংকারও জোরপূর্বক কেড়ে নিচ্ছে।
সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব অবস্থায় দালালের কবলে পড়া এই মানুষেরা এখন লুকিয়ে বা ধার করা ফোনে দেশের মাটিতে থাকা তাদের পরিবার-পরিজনের কাছে ফোন দিয়ে টাকা পাঠানোর জন্য এবং তাদের এই নরককুণ্ড থেকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কান্নাকাটি ও আকুতি-মিনতি জানাচ্ছেন।
এই মানবিক বিপর্যয় দেখে সীমান্তে বসবাসকারী সাধারণ স্থানীয় মানুষ ও ভুক্তভোগীদের আত্মীয়-স্বজন চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকারকে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এবং অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনার জোর আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয়দের ও সাধারণ জনগণের প্রধান প্রশ্ন:
“সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে মিয়ানমারে যখন মুসলিমদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালানো হলো, তখন বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মানবিক কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে এ দেশে আশ্রয় দিল। এ দেশের সাধারণ মানুষও তাদের অন্ন-বস্ত্র ও খাদ্য সামগ্রী দিয়ে সাহায্য করল। অথচ আজ বাংলাদেশের নিজের নাগরিকেরা যখন অন্য দেশে নির্যাতিত হয়ে স্বদেশে ফিরতে চাচ্ছেন, তখন তারা নিজ দেশের সীমান্তে ৪-৫ দিন না খেয়ে পড়ে থাকবে কেন? কেন তাদের রাতের আঁধারে এত বাধা ও হয়রানির সম্মুখীন হতে হবে? আইন ও মানবিকতা কি শুধু বাইরের মানুষের জন্য, দেশের গরিবের জন্য কি কোনো অধিকার নেই?”
মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিজিবি মহাপরিচালকের প্রতি বিশেষ আহ্বান
দৈনিক সাতক্ষীরা দিগন্ত (ডিএসডি টিভি) সব সময় মজলুমের পক্ষে এবং সত্যের পক্ষে কথা বলতে দায়বদ্ধ। হাকিমপুরসহ বিভিন্ন সীমান্তে চলমান এই ভয়াবহ ও লজ্জাজনক মানবিক সংকটের দ্রুত অবসান ঘটাতে আমরা দেশের অভিভাবক মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালকের কাছে রাষ্ট্রীয়ভাবে জরুরি ও মানবিক হস্তক্ষেপের জোর আবেদন জানাচ্ছি
অভাবের কারণে ঘর ছাড়লেও এই অসহায় মানুষেরা এ দেশেরই বৈধ নাগরিক। তারা ভারতের মাটিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রেখেছেন। তাই হাকিমপুরসহ বিভিন্ন সীমান্তে আটকে থাকা ৪-৫ হাজার বাংলাদেশিকে আর কোনো বাধা না দিয়ে অবিলম্বে সসম্মানে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারিভাবে আহ্বান জানানো হোক।
সীমান্তে দীর্ঘ সময় ধরে খোলা আকাশের নিচে হেনস্তা না করে, আগত নাগরিকদের দ্রুত তাদের নিজ নিজ সংশ্লিষ্ট থানা এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসা হোক। সেখানে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির প্রত্যয়নপত্র দ্রুত যাচাই-বাছাই শেষে কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়া তাদের নিজ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।
সীমান্তে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি ও রাত্রিকালীন টহল জোরদার করে যে কতিপয় দালাল ও চাঁদাবাজ চক্র অসহায় মানুষদের জিম্মি করে টাকা-পয়সা ও মোবাইল লুটে নিচ্ছে, তাদের দেখামাত্র কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হোক।
সীমান্তে ৪-৫ দিন ধরে অনাহারে থাকা শিশু, বৃদ্ধ ও মা-বোনদের জন্য বিজিবির পক্ষ থেকে অবিলম্বে জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক।
আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। অভাবের কারণে ঘর ছাড়লেও এই সাধারণ মানুষেরা এ দেশেরই সন্তান ও রেমিট্যান্স যোদ্ধা। বাইরে নির্যাতিত হয়ে ফিরে আসা এই আশ্রয়হীন নাগরিকদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের আইনি ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পরম ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় সীমান্ত প্রহরী বিজিবি সদস্যরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও মানবিকতার পরিচয় দিয়ে দেশের সন্তানদের নিরাপদে ও সসম্মানে কোলে তুলে নেবেন এবং দালালের কবল থেকে তাদের রক্ষা করবেন—এটাই দেশবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।