1. live@dailysatkhirdiganta.com : NEWS TV : NEWS TV
  2. info@www.dailysatkhirdiganta.com : দৈনিক সাতক্ষীরা দিগন্ত :
শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ন

দুদকের মামলায় জেল খাটা দুর্নীতিবাজ নায়েব সুফিয়ান ছিলেন আওয়ামী লীগের দোসর শ্যামনগরে ‘ভূমি সিন্ডিকেটে’ অতিষ্ঠ জনপদ

প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক,

সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি থাকলেও সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। এটি এখন দুর্নীতির এক নিরাপদ দুর্গে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় জেল খাটা কুখ্যাত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) মো. আবু সুফিয়ান এবং তার প্রধান সহযোগী ‘রাজমিস্ত্রি’ মনিরুল ইসলামের গড়ে তোলা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। নামজারি (মিউটেশন), ডিসিআর কাটা থেকে শুরু করে খাজনা আদায়—প্রতিটি ধাপে এই দালাল চক্র ছাড়া মিলছে না কোনো সেবা।

 

সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী সরাসরি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে না পারলেও, নায়েব আবু সুফিয়ান ছিলেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ দোসর। তার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল ও স্থানীয় অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন এবং দলের প্রতিটি দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। এই রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট ও দলীয় প্রভাব খাটিয়েই তিনি দীর্ঘদিন ধরে শ্যামনগরে নিজের উপজেলায় চাকরি টিকিয়ে রেখে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রের প্রধান কারিগর মুন্সিগঞ্জ ও ভেটখালি এলাকার কপিল উদ্দিন কাগচীর ছেলে মনিরুল ইসলাম। একসময় সাধারণ রাজমিস্ত্রির কাজ করলেও বর্তমানে তিনি এলাকায় ‘ভূমি সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত। ভূমি অফিস, সেটেলমেন্ট এবং সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দালালি ও প্রতারণার জাল বিছিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মনিরুলের মাধ্যমে না গেলে নায়েব আবু সুফিয়ান সাধারণ মানুষের বৈধ কাগজপত্রও দিনের পর দিন আটকে রাখেন। সম্প্রতি মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে যাওয়া সাংবাদিকদের কাছে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে, মনিরুল উল্টো টাকা লেনদেনের প্রস্তাব দিয়ে অফিসে ডাকার ধৃষ্টতা দেখান।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নায়েব সুফিয়ান ও তার সিন্ডিকেটের হাতে প্রতারিত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। জমির কাজ করে দেওয়ার নাম করে গোলাম মোস্তফা নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সুফিয়ান।

অনুরূপ অভিযোগ করেছেন মনছুর সরদারের গ্যারেজ এলাকার হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন। তিনি জানান, জমির কাজের কথা বলে তার কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন এই নায়েব। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হলেও কাজ না করে দিয়ে সেই টাকা সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করেছেন। এমন শত শত ভুক্তভোগী এখন প্রতিকারহীন অবস্থায় ঘুরছেন।

 

আবু সুফিয়ানের দুর্নীতির রেকর্ড বেশ দীর্ঘ। এর আগে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও প্রধান সহকারীর স্বাক্ষর জালিয়াতি করার অপরাধে শ্যামনগর থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। মামলার বাদী অ্যাডভোকেট আজিবর রহমানের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ মেলায় আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। এই মামলায় তিনি জেলও খাটেন। কিন্তু জামিনে বা জেল থেকে বেরিয়ে এসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে তিনি পুনরায় আরও শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

 

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা নিজ উপজেলায় দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। কিন্তু আবু সুফিয়ানের বাড়ি শ্যামনগর এলাকায় হওয়ায় প্রশাসনিক নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি বছরের পর বছর একই এলাকায় রয়ে গেছেন।

স্থানীয়দের দাবি, একজন সাধারণ নায়েব হয়েও ক্ষমতার অপব্যবহার করে আবু সুফিয়ান গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। শ্যামনগর সদরে তার রয়েছে:

একটি বিলাসবহুল বাড়ি

দামী প্রাইভেটকার

প্রায় আড়াই লাখ টাকা মূল্যের আধুনিক মোটরসাইকেল

একজন তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীর সমমানের কর্মচারী হয়ে কীভাবে তিনি এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।

 

ভূমি অফিসের এই সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আবু সুফিয়ানের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এমনকি খুদেবার্তা (এসএমএস) পাঠিয়েও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের মতে, তার এই রহস্যজনক নীরবতাই দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতাকে আরও জোরালো করে।

 

মুন্সিগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের দাবি, আওয়ামী লীগের এই দোসর ও দুর্নীতিবাজ আবু সুফিয়ানকে অবিলম্বে সাতক্ষীরা জেলার বাইরে বদলি করা না হলে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। নিজ উপজেলায় দায়িত্ব পালন করার সুবাদে তিনি স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে অনবরত হয়রানি করছেন।

এই ‘নায়েব-দালাল’ সিন্ডিকেটের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে এবং সুফিয়ানের অবৈধ সম্পদের খোঁজে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), বিভাগীয় কমিশনার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আশু হস্তক্ষেপ ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী জনপদ।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
দৈনিক সাতক্ষীরা দিগন্ত