
সাহারা সুলতানা, বিশেষ প্রতিনিধি
সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী একজন নারী কর্মচারী সন্তান জন্মদানের সময় ১৮০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়ে থাকেন। কিন্তু কোনো প্রকার ছুটি না নিয়ে, এমনকি সন্তান প্রসবের দিনগুলোতেও বিদ্যালয়ে ‘উপস্থিত’ থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলনের এক নজিরবিহীন অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক মিতা রানী রায়ের বিরুদ্ধে। এই জালিয়াতির নেপথ্যে মূল কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছেন তার স্বামী ও তৎকালীন প্রধান শিক্ষক নলিনী রঞ্জন মণ্ডল। শুধু দাপ্তরিক জালিয়াতিই নয়, এই দম্পতির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, একাধিক বিবাহ এবং পার্শ্ববর্তী দেশে অর্থ পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১১৯ নং প: খালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকাকালীন মিতা রানী রায় তিন সন্তানের জননী হন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবার তিনি দীর্ঘমেয়াদী ছুটির অধিকারী থাকলেও উপজেলা শিক্ষা অফিসে সংরক্ষিত মাসিক ‘রিটার্ন’ এবং বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোনো প্রসবকালীন সময়েই তিনি দাপ্তরিকভাবে ছুটি গ্রহণ করেননি।
অভিযোগ উঠেছে, তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ও তার স্বামী নলিনী রঞ্জন মণ্ডল পদের প্রভাব খাটিয়ে হাজিরা খাতায় মিতা রানীর ভুয়া উপস্থিতি নিশ্চিত করতেন। সন্তান প্রসবের সময়েও সশরীরে বিদ্যালয়ে উপস্থিত দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন করা হয়েছে, যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের শামিল।
সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও অবৈধ সাম্রাজ্য
নলিনী রঞ্জন মণ্ডলের আয়ের সাথে অসংগতিপূর্ণ বিপুল সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পিরোজপুর গ্রামের খাজরা ইউনিয়নে আলিশান বাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি তিনি অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাচার করেছেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ভারতের কেনকাটি নামক এলাকায় নলিনী রঞ্জন জমি ক্রয় করেছেন এবং সেখানে একটি বাড়িও নির্মাণ করেছেন। বর্তমানে সেই বাড়িতে তার আপন ভাগ্নি জামাই বসবাস করছেন। একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের পক্ষে বিদেশে জমি ও বাড়ি করা কেবল নীতিবহির্ভূতই নয়, বরং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
নলিনী রঞ্জন মণ্ডলের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক দুর্নীতির পাশাপাশি চরম নৈতিক স্খলনের অভিযোগ রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তিনি এ পর্যন্ত চারটি বিবাহ করেছেন। বর্তমানে দুই স্ত্রী ও তিন সন্তান থাকা সত্ত্বেও অন্য নারীর সাথে পরকীয়া এবং খুলনায় জমি কিনে দেওয়ার মতো অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
বর্তমানে নলিনী রঞ্জন প: ফটিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং মিতা রানী রায় বাগালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকলেও তারা নিয়মিত কর্মস্থলে যান না বলে স্থানীয়রা নিশ্চিত করেছেন। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় তারা বছরের পর বছর বিদ্যালয় ফাঁকি দিলেও অদৃশ্য কারণে প্রশাসন নীরব রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, “হাজিরা খাতায় জালিয়াতি করে বেতন উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হবে। এছাড়া বিদেশে সম্পদ গড়ার বিষয়টি যদি প্রমাণিত হয়, তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।”