
মোঃ মেহেদী হাসান সম্পাদক ও প্রকাশক
ঝিনাইদহের সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলায় ঘুরতে এসে এক ভয়ংকর প্রতারণা ও সশস্ত্র ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন খুলনা থেকে আসা এক পর্যটক। ভারতে ঘুরিয়ে আনার প্রলোভন দেখিয়ে এবং পরবর্তীতে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ টাকা ও দামী স্মার্টফোন লুটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক চিহ্নিত মানব পাচারকারী ও দালালের বিরুদ্ধে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার মূল হোতা মহেশপুর উপজেলার নলবিল পাড়ার ইউসুফ আলীর ছেলে জামাল হোসেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্ত কেন্দ্রিক এই অপরাধী চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বহিরাগত পর্যটকদের টার্গেট করে নিখুঁত ফাঁদ পেতে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার (আঞ্চলিক উচ্চারণভেদে চোরামুখ) গ্রামের প্রশান্ত মন্ডলের ছেলে নিলয় মন্ডল ভ্রমণপিপাসু হিসেবে সম্প্রতি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় ঘুরতে আসেন। সেখানে সীমান্ত এলাকায় ঘোরাঘুরির একপর্যায়ে কতিপয় ব্যক্তির মাধ্যমে তার পরিচয় হয় স্থানীয় দালাল জামাল হোসেনের সাথে। জামাল অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিলয়কে আশ্বস্ত করে যে, সে কোনো ঝামেলা ছাড়াই তাকে সীমান্ত পার করে ভারত ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে।
সরল বিশ্বাসে নিলয় তার প্রস্তাবে রাজি হলে, জামাল তাকে মহেশপুরের নলবিল পাড়ার একটি নির্জন ও প্রত্যন্ত এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই পূর্বপরিকল্পিতভাবে জামাল ও তার সহযোগীরা ধারালো ছুড়ি বের করে নিলয়ের ওপর চড়াও হয়। প্রাণনাশের তীব্র হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা নিলয়ের কাছে থাকা নগদ ২২,০০০ টাকা এবং তার ব্যবহৃত ‘Vivo Y200 Pro 5G’ মডেলের দামী স্মার্টফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে চম্পট দেয়।
নিলয় মন্ডল কোনোমতে ঘটনাস্থল থেকে প্রাণরক্ষা করে ফিরে এসে স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজখবর শুরু করেন। পরবর্তীতে কৌশলে অভিযুক্ত জামালের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে তার সুনির্দিষ্ট পরিচয় শনাক্ত করা হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, জামাল হোসেন মূলত একজন পেশাদার দালাল এবং মানব পাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য।
তার মূল কৌশল হলো—দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মহেশপুর সীমান্ত এলাকায় আসা পর্যটকদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। এরপর অবৈধভাবে সীমান্ত পার করার স্বপ্ন দেখিয়ে নির্জন স্থানে ডেকে এনে অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব লুটে নেওয়া। আইনি জটিলতা এবং অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টার দায়ে ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে সাধারণত ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করতে চান না। আর এই সুযোগটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জামাল হোসেন প্রতিনিয়ত পর্যটকদের সর্বস্বান্ত করছে।
ভুক্তভোগী নিলয় মন্ডল ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন,
“ওরা যেভাবে আকস্মিক ছুড়ি ধরে আমার সব কেড়ে নিয়েছে, আমি চরম আতঙ্কে ছিলাম। পরে জানতে পেরেছি এভাবে আরও বেশ কয়েকজন যুবকের কাছ থেকে তারা টাকা ও মোবাইল লুটে নিয়েছে। আমরা অন্য জেলা থেকে এই এলাকায় ঘুরতে এসে যদি এভাবে অপরাধীদের জিম্মি হই, তবে দেশের পর্যটনের যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি এই অঞ্চলের সুনামও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে। আমি এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা মুঠোফোনের মাধ্যমে অভিযুক্ত জামাল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করলে সে অত্যন্ত ধৃষ্টতার সাথে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে। জামাল জানায়, সে মূলত ১৫,০০০ টাকার বিনিময়ে অবৈধ উপায়ে ভারতে লোক পারাপার করে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষদের সে প্রলোভন দেখিয়ে এখানে নিয়ে আসে এবং একপর্যায়ে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান সামগ্রী লুটে নিয়ে তাড়িয়ে দেয়।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পর্যটন বা অন্য যেকোনো কারণে এক জেলার মানুষ অন্য জেলায় ভ্রমণ করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মহেশপুর সীমান্তে যেভাবে সিন্ডিকেট করে বহিরাগতদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই দালাল চক্রের কারণে সীমান্ত সুরক্ষাও হুমকির মুখে পড়ছে।
ভুক্তভোগী পরিবার এবং সচেতন নাগরিক সমাজ এই বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মহোদয় এবং মহেশপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কুখ্যাত দালাল ও ছিনতাইকারী জামাল হোসেনকে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানানো হয়েছে।