
বিশেষ প্রতিনিধি
মোংলা বন্দরকে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্ষম ও সচল রাখতে অবশেষে সমাপ্তির পথে আউটার বারের পর অন্যতম বৃহত্তম চ্যানেল ‘ইনার বার ড্রেজিং’ প্রকল্পের কাজ। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দীর্ঘ সাড়ে ৬ বছর পর আগামী ৩০ জুন এই মেগা প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বালু ডাম্পিংয়ের জমি সংকটসহ নানা জটিলতায় কয়েক দফায় সময় ও ব্যয় গিয়ে দাড়ায় ৯শ ৯২ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, চলমান প্রকল্প শেষ হলে এবং ম্যান্টেনেজ ড্রেজিংয়ের কাজ চলমান থকলে ৯ থেকে সাড়ে ৯ মিটারের বানিজ্যি জাহাজ বিদেশ থেকে সরাসরী অনায়াসে প্রবেশ করতে পারবে মোংলা বন্দরে। বন্দর সূত্রে জানায়, আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইনার বার ড্রেজিং প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের ১৩ মার্চ। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২২ সালের শেষের দিকেই কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্ত বালু ফেলার (ডাম্পিং) জায়গা নিয়ে তীব্র জমি জটিলতা এবং ড্রেজিং চলাকালীনই চ্যানেল পুনরায় ভরাট হয়ে যাওয়ার মতো প্রাকৃতিক বাধার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। সব বাধা অতিক্রম করে দীর্ঘ সাড়ে ৬ বছরের মাথায় আগামী ৩০ জুনে এই প্রকল্প সম্পন্ন হচ্ছে বলে জানায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। চ্যানেলের নাব্যতা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মোংলা বন্দরের হারবাড়িয়া এলাকা থেকে বন্দর জেটি পর্যন্ত মোট ২৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার চ্যানেল ড্রেজিং করা হয়েছে। এ থেকে প্রায় ২ কোটি ৩৭ লক্ষ ঘন মিটার বালু ও পলি মাটি উত্তোলন করা হয়। শুরুতে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭শ ৯৩ কোটি ৭২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তবে নকশা পরিবর্তন, সময় ও অর্থ বৃদ্ধিতে তিন ধাপে বাজেট সংশোধন করে বর্তমান ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯৯২ কোটি টাকায়। চ্যানেল দিয়ে মূলত সাড়ে ৯ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের (গভীরতার) বড় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যাতে কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই সরাসরি বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে সেই লক্ষ্যেই এই মেঘা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। তবে ড্রেজিংয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে চলে এলেও নদী ও চ্যানেলের অতি দ্রুত ভরাট হয়ে যাওয়ার প্রকৃতির কারণে বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীদের মনের নাব্যতা সংকট সংক্রান্ত শঙ্কা পুরোপুরি কাটছে না। আগামী ৩০ জুন এই প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণার পর নতুন অর্থ বছরের শুাং থেকেই পুরো চ্যানেলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বা মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং-এর কাজ শুরু হবে, যাতে ড্রেজিং করা অংশ পুনরায় ভরাট হয়ে চ্যানেলের কার্যকারিতা নষ্ট না হয়। তবে বন্দরকে সচল রাখা ও ব্যাবসায়ীদের সুবিধার্থে খনন কৃত চ্যানেলেরে ড্রাফ পুর্নবিবেচনার দাবী বন্দর ব্যাবহারকারীদের। বন্দরের ব্যাবসায়ীরা ড্রেজিং নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, ড্রেজিং অসম্পন্ন থাকলে পলি জমে চ্যানেল ভরাট হয়ে যায়। এর ফলে জাহাজগুলোকে দিনের পর দিন আউটার বারে বা মাঝনদীতে অপেক্ষা করতে হয়। অতিরিক্ত এই অপেক্ষমাণ সময়ের কারণে ব্যবসায়ীদের বিশাল অঙ্কের ডেমারেজ চার্জ (জাহাজ জরিমানা) গুনতে হয়, যা সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি খরচ অনেক বাড়িয়ে দেয়। তাই নিয়মিত ও সময়মতো ড্রেজিং সম্পন্ন না হলে ইনার বারের (হাড়বাড়িয়া থেকে বন্দর জেটি পর্যন্ত) গভীরতা কমে যাবে। এর ফলে ৯ থেকে ৯.৫০ মিটার ড্রাফটের (গভীরতার) বড় বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সরাসরি জেটিতে আসতে পারবে না। গভীরতা সংকটের কারণে জাহাজগুলোকে মাঝনদীতে রেখে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করতে হবে, যা বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করবে। বন্দরের শিপিং এজেন্ট এবং ব্যবহারকারীদের মতে, একটি সচল ও আন্তর্জাতিক মানের বন্দরের প্রধান শর্তই হলো চ্যানেলের ড্রাফট বা গভীরতা ঠিক রাখা। ড্রেজিং অনিশ্চিত হয়ে পড়লে বিদেশি শিপিং লাইনগুলো মোংলা বন্দরে জাহাজ পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করবে। ফলে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে আবার চট্টগ্রামমুখী হবেন, যা মোংলা বন্দরের অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। ইনার বার ড্রেজিং প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিভিল এন্ড হাইডোলিক) বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী শেখ শওকত আলী জানান,মোংলা বন্দরের জয়মনিরগোল থেকে জেটি পর্যন্ত পশুর চ্যানেলের প্রায় ২৩.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ইনার বার ড্রেজিংয়ের ফলে বন্দরের মূল নাব্যতা সংকট স্থায়ীভাবে দূর হয়েছে। এর ফলে ৯.৫০ মিটার থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের (গভীরতার) বড় বড় কনটেইনার ও কার্গো জাহাজ সরাসরি মোংলা বন্দরের জেটিতে এসে নোঙর করতে পারবে। আগে যেখানে মাত্র ৭ মিটার ড্রাফটের জাহাজ আসতে পারত, ড্রেজিংয়ের ফলে সেই সীমাবদ্ধতা কেটে যাবে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, এই ড্রেজিং প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন মোংলা বন্দরকে একটি আন্তর্জাতিক মানের এবং অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী বন্দরে রূপান্তরিত করবে। এটি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের একটি যোগ্য ও চমৎকার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হবে, যা দেশের সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করবে। তিনি প্রকল্প পরিচালক হিসেবে জানান, এই প্রকল্পের আওতায় নদী থেকে প্রায় ২১৬.০৯ লাখ ঘনমিটার বালু ও পলি অপসারণ বা খনন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই বিশাল ড্রেজিং কাজটি যৌথভাবে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল চীনা দুটি প্রতিষ্ঠান ‘জিয়াংশু হাইহং কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড এবং ‘চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন দেয়া হয়েছিল। পরে তাদের মাধ্যমেই অন্য ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করেছে। ২০১৮ সালে শুরু হয়ে ২০২০ সালের জানুয়ারীতে শেষ হয়েছিল প্রকল্প চ্যানেল “আউটার বার” ড্রেজিংয়ের কাজ। ব্যয়ে হয়েছিল ৭শ ১২ কোটি টাকা। আর এটিই ছিল মোংলা বন্দর সৃষ্টির দীর্ঘ ৭০ বছরের ইতিহাসের প্রথম ড্রেজিংয়ের কাজ।