
নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থায় বহুবার পরিবর্তন এসেছে। কখনো নির্বাচনের মাধ্যমে, কখনো রাষ্ট্রপতির নিয়োগে, আবার কখনো রাজনৈতিক সংকট ও সামরিক শাসনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন। কিছু সময়ে প্রধানমন্ত্রীর পদই ছিল না; তখন রাষ্ট্রপতি, সামরিক শাসক অথবা তত্ত্বাবধায়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টারা সরকার পরিচালনা করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তাজউদ্দীন আহমদ: যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ। ১০ এপ্রিল সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয় এবং ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, পরে যার নাম হয় মুজিবনগর, সরকার শপথ নেয়। নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ না থাকায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমর্থনের ভিত্তিতে তিনি সরকারপ্রধান হন। তাঁর দায়িত্বকাল ছিল ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ থেকে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২।
শেখ মুজিবুর রহমান: দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব
পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশে ফেরেন শেখ মুজিবুর রহমান। দুই দিন পর সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু করে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বড় বিজয়ের পরও তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হওয়া পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন।
এম মনসুর আলী: রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হলে শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। তখন এম মনসুর আলীকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়। বাকশালভিত্তিক একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে তিনি ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
শাহ আজিজুর রহমান: জিয়ার আমলে প্রধানমন্ত্রীর পদে
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কয়েক বছর দেশে কার্যকর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। তবে সে সময় রাষ্ট্রের মূল নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতেই ছিল। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর সরকারের অবসান ঘটে।
আতাউর রহমান খান: এরশাদের নিয়োগে প্রধানমন্ত্রী
সামরিক শাসনের দুই বছর পর ১৯৮৪ সালের ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ প্রবীণ রাজনীতিক আতাউর রহমান খানকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। পরে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। রাষ্ট্রপতিশাসিত কাঠামোয় তাঁর ক্ষমতা সীমিত ছিল। তিনি ১৯৮৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
মিজানুর রহমান চৌধুরী: জাতীয় পার্টির সরকারপ্রধান
আতাউর রহমান খানের পর ১৯৮৬ সালের ৯ জুলাই জাতীয় পার্টির নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী হন। এরশাদ সরকারের অধীনে সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনা করলেও রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী ছিলেন রাষ্ট্রপতি এরশাদ। তিনি ১৯৮৮ সালের মার্চ পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন।
মওদুদ আহমদ: এরশাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী
১৯৮৮ সালের ২৭ মার্চ রাষ্ট্রপতি এরশাদ মওদুদ আহমদকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। তিনি তখন জাতীয় পার্টির নেতা ছিলেন। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি করা হলে প্রধানমন্ত্রীর পদে পরিবর্তন আসে।
কাজী জাফর আহমদ: এরশাদ আমলের শেষ প্রধানমন্ত্রী
১৯৮৯ সালের ১২ আগস্ট মওদুদ আহমদের স্থলাভিষিক্ত হন জাতীয় পার্টির কাজী জাফর আহমদ। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন হলে তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বও শেষ হয়।
খালেদা জিয়া: নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
এরশাদের পতনের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ায় অন্য সংসদ সদস্যদের সমর্থন নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেন। ২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর সরকারের সময় দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি অল্প সময়ের জন্য আবার প্রধানমন্ত্রী হন। আন্দোলনের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করে ৩০ মার্চ ক্ষমতা ছাড়েন। পরে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের বড় বিজয়ের মাধ্যমে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
শেখ হাসিনা: পাঁচ দফায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব
১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সর্বাধিক আসন লাভ করে এবং মিত্রদের সমর্থনে সরকার গঠন করে। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা ২৩ জুন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং ২০০১ সালের জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বড় বিজয়ের পর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের পরও সরকার গঠন করেন। এসব নির্বাচনের কয়েকটি বিরোধী দলের বর্জন ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশ-বিদেশে বিতর্কের মুখে পড়ে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশ ত্যাগ করলে তাঁর টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
তারেক রহমান: ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রত্যাবর্তন
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। প্রায় ১৮ মাস পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও তার মিত্ররা স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এরপর বিএনপির সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হয়ে তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক পর বিএনপি আবার সরকার গঠন করে।
যে সময়গুলোতে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না
স্বাধীনতার পর কয়েকটি পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে অন্য পদধারীরা সরকার পরিচালনা করেছেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ এবং ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ও সামরিক শাসকের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ছিল। ১৯৯০–৯১ সালে শাহাবুদ্দীন আহমদ, ১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ২০০১ সালে বিচারপতি লতিফুর রহমান এবং ২০০৬–০৯ সময়ে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, বিচারপতি ফজলুল হক ও ফখরুদ্দীন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিচালনা করেন। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরা সরকারপ্রধান হলেও কেউ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না।