
কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি
কোলে নবজাতক সন্তান। হাসপাতালের বেডে অস্ত্রোপচারের পর অসুস্থ স্ত্রী। সামনে চিকিৎসার বিল। অথচ হাতে নগদ টাকা নেই। এমন পরিস্থিতিতে নিজের আমানত করা ৪ লাখ টাকা থেকে জরুরি প্রয়োজনে ৫০ হাজার টাকা চেয়েও তা পাননি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের সাংবাদিক রেদওয়ান ফেরদৌস রনি। শেষ পর্যন্ত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে প্রায় এক লাখ টাকা ধার করে স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ মেটাতে হয়েছে তাঁকে।
রেদওয়ান ফেরদৌস রনি জাতীয় দৈনিক ‘বাংলাদেশ সমাচার’-এর কালিগঞ্জ প্রতিনিধি এবং কালিগঞ্জ রিপোর্টার্স ক্লাবের নির্বাহী সদস্য। তাঁর অভিযোগ, বাবার পেনশনের জমানো ৪ লাখ টাকা ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা ভেবে কালিগঞ্জের বুশরা ইসলামী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডে আমানত রেখেছিলেন। প্রয়োজনের সময় সেই টাকা পরিবারের কাজে লাগবে—এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি।
রনি জানান, সম্প্রতি তাঁর স্ত্রীর জরায়ুতে টিউমার ধরা পড়ে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ৮ আগস্ট তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি আরও একটি অস্ত্রোপচার করতে হয়। এ সময় তাঁদের সন্তান জন্ম নেয়। একদিকে নবজাতকের আগমন, অন্যদিকে অসুস্থ স্ত্রী—সব মিলিয়ে বেড়ে যায় চিকিৎসার খরচ।
গত ১৩ আগস্ট হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার সময় চিকিৎসা বাবদ লক্ষাধিক টাকা বিল আসে। এ অবস্থায় নিজের আমানতের টাকা পাওয়ার আশায় বুশরা গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন রনি। তাঁর ভাষ্য, বুশরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম, পরিচালক ইকবাল কবীর পলাশ ও এরিয়া ম্যানেজার রফিকুল ইসলামকে তিনি পরিস্থিতির কথা জানান। নিজের জমা ৪ লাখ টাকা থেকে অন্তত ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেন। তবে একাধিকবার যোগাযোগ ও আশ্বাসের পরও টাকা পাননি বলে অভিযোগ তাঁর।
রনি বলেন, “আমার স্ত্রী হাসপাতালে, সদ্য সন্তান হয়েছে। চিকিৎসার জন্য জরুরি টাকা দরকার ছিল। বুশরায় আমার নিজের টাকা জমা আছে। মাত্র ৫০ হাজার টাকা চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই টাকাটাও পেলাম না।”
পরে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে প্রায় এক লাখ টাকা ধার করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
আরও আমানতকারীর অভিযোগ
রনির মতো বুশরা গ্রুপে টাকা জমা রাখা আরও কয়েকজন আমানতকারীরও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, নিয়মিত সঞ্চয় ও আমানত করলেও প্রয়োজনের সময় নিজেদের টাকা ফেরত পেতে সমস্যায় পড়ছেন তাঁরা।
আমানতকারীদের কয়েকজন জানান, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনে টাকা তুলতে গিয়ে তাঁদের নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। টাকা ফেরত চাইলে কখনো তারল্য সংকট, কখনো সময়ের প্রয়োজন, আবার কখনো প্রশাসনিক জটিলতার কথা বলা হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
তাঁদের দাবি, কালিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বুশরা গ্রুপের কার্যক্রম ও প্রকল্প থাকলেও আমানতকারীদের অনেকে তাঁদের জমা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। সম্প্রতি বুশরার বিভিন্ন অফিস বন্ধ থাকা এবং গ্রাহকদের টাকা ফেরত না পাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়েও ক্ষোভ বাড়ছে বলে দাবি তাঁদের।
তদন্তের দাবি
ভুক্তভোগী আমানতকারীরা তাঁদের জমা টাকা ফেরতের পাশাপাশি বুশরা গ্রুপের আর্থিক কার্যক্রম, সম্পদ, আমানত সংগ্রহ ও অর্থের ব্যবহার তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলেরও দাবি, সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
‘তারল্য সংকটের কারণে টাকা দিতে পারছি না’
অভিযোগের বিষয়ে বুশরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম বলেন, “তারল্য সংকটের কারণে আমরা গ্রাহকদের টাকা দিতে পারছি না।”
কবে নাগাদ গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করা হবে—এমন প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সদ্যোজাত সন্তানকে ঘিরে আনন্দের মুহূর্তে নিজের জমানো টাকা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসার খরচ জোগাতে অন্যের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছে সাংবাদিক রনিকে। তাঁর এই ঘটনা বুশরা গ্রুপে আমানত রাখা অন্য গ্রাহকদের মধ্যেও তাঁদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।