
শাহিনুর ইসলামঃ বিশেষ প্রতিনিধি :
নদীর তলদেশ দিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও, বিশাল আকৃতির পানির পাইপ বসানো হয়েছে নদীর মাঝ বরাবর পানির ওপর দিয়ে। ফলে বাগেরহাটের ফকিরহাটে ভৈরব নদের চিরচেনা রূপ এখন বিলীন হওয়ার পথে। খুলনা ওয়াসার একটি মেগা প্রকল্পের এমন আত্মঘাতী ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হচ্ছে তিন উপজেলার লাখো মানুষকে। নদীতে নৌযান চলাচল পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নাব্য সংকট ও কৃত্রিম বন্যা। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে উন্নয়ন এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরেজমিনে জানা যায়, খুলনা মহানগরীতে সুপেয় পানি সরবরাহের লক্ষ্যে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাইপলাইন স্থাপন করে খুলনা ওয়াসা। ২০১৯ সালে বাগেরহাটের মোল্লাহাটের মধুমতি নদী থেকে পানি নেওয়ার এই প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের গলদ ধরা পড়ে ফকিরহাট অংশে। ভৈরব নদ পারাপারের সময় মাটির গভীর দিয়ে পাইপ নেওয়ার সাধারণ নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তা বসানো হয় নদীর বুক চিরে। সাড়ে পাঁচ ফুট ব্যাসের এই দানবীয় পাইপটি নদের প্রায় অর্ধেক অংশ দখল করে রেখেছে। শুধু তাই নয়, পাইপের সুরক্ষার অজুহাতে উপরিভাগে লোহার পাত বসিয়ে নদীর বুক কার্যত সিলগালা করে দিয়েছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। এই এক পাইপের কারণে রূপসা-ফকিরহাট-চিতলমারী-বাগেরহাট সদর এই ৪টি উপজেলার সাথে নৌযোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নৌপথ বন্ধ হওয়ায় এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এলাকায় বহুমুখী সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই নদীর পানি উপচে আশপাশের লোকালয় প্লাবিত হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা। মাঠের পর মাঠ কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে থাকায় পচে নষ্ট হচ্ছে খেতের ফসল। এই অঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি মৎস্য ঘেরগুলো। নদী উপচে পানি ঢুকে পড়ায় ভেসে গেছে শত শত ঘেরের মাছ, যার ফলে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী জানান, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান কীভাবে নদী ও পরিবেশের এত বড় ক্ষতি করে প্রকল্প পাস করে, তা তাদের বোধগম্য নয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই পাইপলাইন নদী থেকে অপসারণ করে মাটির তলদেশে স্থানান্তরের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় আন্দোলন আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে খুলনা ওয়াসার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নকশাগত জটিলতার কারণে সাময়িকভাবে পাইপটি ওভাবে বসানো হয়েছিল। স্থানীয়দের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই পাইপলাইনটি নদীর তলদেশ দিয়ে নতুন করে স্থাপন করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের এই ‘পরিকল্পনা’ কবে নাগাদ বাস্তবে রূপ নেবে, আর কতদিন ফকিরহাটবাসীকে এই দুর্ভোগ পোহাতে হবে—সেই প্রশ্নই এখন জোরালো হয়ে উঠেছে