ফাটলধরা ভবন গোপনে হস্তান্তরের অভিযোগ: শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে ‘নীরব প্রক্রিয়া’, তদন্ত ও জবাবদিহিতা দাবি এলাকাবাসীর

মোঃ ফজলু মিয়া ,ওসমানীনগর
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার খুজগিপুরে অবস্থিত খুজগিপুর পুর মান উল্লাহ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন একাডেমিক ভবন হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক ও জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৮-৯ বছর আগে নির্মিত ভবনটিতে ফাটল, ছাদ দিয়ে পানি চুঁইয়ে পড়াসহ নানা নির্মাণ ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টদের অবহিত না করে ভবন হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, ভবন হস্তান্তরের দিন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়া হয় এবং সীমিত পরিসরে কার্যক্রম সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকাজুড়ে ক্ষোভ ও আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিক মোঃ ফজলু মিয়া জানান, ভবন হস্তান্তরের খবর পেয়ে তিনি বিদ্যালয়ে গেলে সেখানে কোনো শিক্ষার্থীকে দেখতে পাননি। বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো হস্তান্তরের সময় শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পরিচালনা কমিটি কিংবা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অনুপস্থিতি পুরো বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উমরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান চেরাগ আলী বলেন, “বিদ্যালয়ের নতুন ভবন হস্তান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাকে বা এলাকার অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিকে অবহিত করা হয়নি। স্থানীয়দের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পেরেছি।”
লামা ইসবপুর গ্রামের সমাজসেবক আব্দুর রউফ বলেন, “বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরেই স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় জনগণকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।”
বড় ইসবপুর গ্রামের বাসিন্দা ও অভিভাবক আংগুর আলী বলেন, “আমার সন্তান এই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। স্থানীয়ভাবে শুনছি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এখন আবার ভবনের ছাদ দিয়ে পানি পড়া ও ফাটল থাকার কথা শোনা যাচ্ছে। এমন অবস্থায় ভবন হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া উদ্বেগজনক।”
স্থানীয় অভিভাবক মোঃ আব্দুস সামাদ বলেন, “যে ভবন নিয়ে এত অভিযোগ, সেটি আগে প্রকৌশলীদের মাধ্যমে পরীক্ষা করা উচিত। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই ভবন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
স্থানীয় যুব প্রতিনিধি মোহাম্মদ রুবেল আহমদ বলেন, “জনগণের অর্থে নির্মিত একটি ভবনের বিষয়ে জনগণকে অন্ধকারে রেখে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।”
এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি হাজী আব্দুল কাদির বলেন, “যদি নির্মাণ কাজে অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানও দীর্ঘদিন ধরে আশানুরূপ নয়। তারা দাবি করেন, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এ বিষয়ে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশা বলেন, “এটি মূলত উপজেলা প্রশাসনের বিষয় নয়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিষয়। তারপরও আমি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে বলেছি, যথাযথভাবে কাজ বুঝে না নিয়ে যেন কোনোভাবেই ভবন রিসিভ না করেন।”
অন্যদিকে, সিলেট শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শামসুল আরেফিন খান বলেন, “ভবনটির বিষয়টি ইতোমধ্যে পর্যালোচনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তাদের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করে কাজ সম্পন্ন করা হবে।”
এ বক্তব্যের পর ভবন হস্তান্তর নিয়ে ওঠা অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি ভবনের কাজ ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল হয়ে থাকে, তাহলে সেই ভবন হস্তান্তরের উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়েছিল?
এলাকাবাসীর দাবি, ভবনের গুণগত মান যাচাইয়ে একটি নিরপেক্ষ কারিগরি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংস্কার কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরই ভবন ব্যবহারের অনুমতি দিতে হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, সরকারি অর্থে নির্মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নিয়ে কোনো ধরনের গোপনীয়তা বা অব্যবস্থাপনা জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে। তাই বিষয়টির স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত সমাধান এখন সময়ের দাবি।