
নিজস্ব প্রতিনিধি
ভোটের রাজনীতি নেই, নেই কোনো জনপ্রতিনিধি হওয়ার উচ্চাভিলাষ। অথচ সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের প্রতিটি প্রান্তের অসহায় মানুষের শেষ ভরসাস্থল এখন একটি পরিবার। প্রবাসের উচ্চবিত্ত জীবনের মোহ পাশে ঠেলে নিজ জন্মভূমির অবহেলিত মানুষের ভাগ্যবদল করে দিচ্ছেন এক উচ্চশিক্ষিত প্রবাসী ও তাঁর ব্যবসায়ী ভাই। সম্পূর্ণ পারিবারিক অর্থায়নে ঘর নির্মাণ, খাদ্য সহায়তা এবং ঋণগ্রস্তদের আইনি ও আর্থিক মুক্তি দেওয়ার এক নীরব মানবিক বিপ্লব চলছে এই জনপদে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই মানবিক কর্মকাণ্ডের কিছু খণ্ডচিত্র ছড়িয়ে পড়লে তা নজর কাড়ে আঞ্চলিক গণমাধ্যমের। এরই প্রেক্ষিতে মাঠপর্যায়ে নিবিড় তথ্য অনুসন্ধান চালায় ডিজিটাল নিউজ মিডিয়া ‘দৈনিক সাতক্ষীরা দিগন্ত’ ও ‘ডিএসডি টিভি’। অনুসন্ধানে উঠে আসে এক অনুকরণীয় ও অনন্য দৃষ্টান্তের নেপথ্য গল্প।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের লড়াকু ব্যক্তিত্ব, মরহুম হাজী আমেদ আলীর মেজাজ ও মনন ধারণ করেছেন তাঁর সন্তানেরা। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র আলহাজ্ব মোস্তফা সিরাজুল ইসলাম খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেন। এরপর মেধার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ (বৃত্তি) নিয়ে সৌদি আরবের ঐতিহ্যবাহী মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন।
ইসলামী চিন্তাধারা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করতে তিনি পরবর্তীতে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সেখানে বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সফলতার সাথে উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি দুই পুত্র ও দুই কন্যার জনক এবং সপরিবারে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। সেখানে একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত থেকে অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশ তিনি প্রতি মাসে পাঠিয়ে দিচ্ছেন নিজ গ্রামে, শুধু মানবকল্যাণের ব্রত নিয়ে।
লন্ডনে বসে মোস্তফা সিরাজুল ইসলাম যে মানবিক রূপরেখা তৈরি করেন, সাতক্ষীরার মাটিতে থেকে তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করছেন তাঁর ছোট ভাই, স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলাম। ‘দৈনিক সাতক্ষীরা দিগন্ত’ ও ‘ডিএসডি টিভি’-র সম্পাদক ও প্রকাশক মো. মেহেদী হাসানের দিকনির্দেশনায় পরিচালিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই সহায়তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক উন্মোচিত হয়েছে
কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের যেসব ভূমিহীন বা অত্যন্ত দরিদ্র মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে তাদের টেকসই ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে এই পরিবারটি।
সামাজিকভাবে চিহ্নিত চরম অভাবী পরিবারগুলোর ঘরে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী নিয়মিত পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
গ্রামীণ চড়া সুদ বা ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে যারা দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিলেন, তাঁদের নগদ অর্থ দিয়ে ঋণমুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন মো. নজরুল ইসলাম।
নিভৃতে চলা এই বিশাল কর্মযজ্ঞের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলাম অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জানান,
“আমরা কোনো চেয়ারম্যান বা মেম্বার পদপ্রার্থী নই, সমাজ বা রাজনীতির কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিও নই। আমাদের মরহুম পিতা-মাতার স্বভাব এবং তাঁদের দেওয়া শিক্ষা ও দোয়ার বরকতেই আমরা এই কাজ করছি। আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে আমাদের পারিবারিক তহবিল গঠন করে আমরা এই সেবা দিয়ে আসছি। এখানে কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ নেই, কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রয়াস।”
তিনি দেশের এবং সমাজের অন্যান্য বিত্তশালীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আরও বলেন,
“আমাদের এই উদ্যোগের খবর বা ভিডিও দেখে যদি সমাজের অন্যান্য ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা উদ্বুদ্ধ হন এবং যার যার এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, তবে এই দেশে কোনো দরিদ্র মানুষ থাকবে না। আমরা চাই মানুষ মানুষকে ভালোবাসুক।”
ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলাম অনুসন্ধানী টিমকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি বিশেষ ঘোষণা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, কৃষ্ণনগর ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কোনো প্রকৃত অসহায়, গৃহহীন বা চরম সংকটাপন্ন মানুষ যদি সরাসরি তাঁদের কাছে পৌঁছাতে না পারেন, তবে তারা ‘দৈনিক সাতক্ষীরা দিগন্ত’ এবং ‘ডিএসডি টিভি’-র কার্যালয় বা প্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই সাপেক্ষে, তাঁদের পারিবারিক তহবিল থেকে সেই সমস্ত বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দ্রুততম সময়ে স্থায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
লন্ডন থেকে কৃষ্ণনগর—মেধা, সততা আর নিখাদ দেশপ্রেমের এই সেতুবন্ধন আজ সমাজ পরিবর্তনের এক নতুন মডেল তৈরি করেছে, যা বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক বিরল ও অনুকরণীয় অধ্যায়।