
সাহারা সুলতানা, বিশেষ প্রতিনিধি
আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াত শেষে বাড়ি ফেরার পথে তিন বছরের কন্যাসন্তানসহ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়া গৃহবধূর সন্ধান মিলল দীর্ঘ ১১ দিন পর। তবে জীবিত নয়, ফরিদপুরের একটি নির্জন পুকুরপাড় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে মা ও মেয়ের অর্ধগলিত মরদেহ। একটি কুকুরের অস্বাভাবিক চলাফেরার সূত্র ধরে পুলিশ মাটির নিচে পুঁতে রাখা এই জোড়া লাশ উদ্ধার করে। চাঞ্চল্যকর এই জোড়া খুনের পর থেকেই ঘটনার পেছনে থাকা ভয়ংকর রহস্য উন্মোচিত হতে শুরু করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত গৃহবধূর নাম জাহানারা বেগম (প্রতিবেদনের শুরুতে সুফিয়া হিসেবে উল্লেখিত) এবং তার তিন বছর বয়সী শিশুকন্যার নাম মরিয়ম। জাহানারা ও তার স্বামী আমজাদ শেখ একই ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৪ মে আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাওয়ার কথা বলে শিশুকন্যা মরিয়মকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন জাহানারা বেগম। কিন্তু রাত পেরিয়ে গেলেও তারা আর বাসায় ফিরে আসেননি। এরপর পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সকল স্থান ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করেও তাদের কোনো সন্ধান পাননি। কোনো উপায় না পেয়ে পরবর্তীতে জাহানারার স্বামী আমজাদ শেখ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
নিখোঁজের টানা ১১ দিন পর, গত ১৪ মে (বৃহস্পতিবার) বিকেলে ফরিদপুরের চরমাধবদীয়া ইউনিয়নের কালীতলা জতিনবদ্দি এলাকার একটি নির্জন পুকুর পাড়ে স্থানীয়রা কয়েকটি কুকুরের অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক চলাফেরা দেখতে পান। একপর্যায়ে কুকুরের দলটি মাটির নিচ থেকে মানুষের একটি পা টেনে বের করে আনে। এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে খবর দেন।
খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মাটি খুঁড়ে প্রথমে জাহানারার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে। এরপর একই গর্তে তার পাশ থেকেই উদ্ধার করা হয় তিন বছরের শিশু মরিয়মের মৃতদেহ। পরে খবর পেয়ে নিখোঁজ গৃহবধূর স্বজনরা ঘটনাস্থলে এসে মরদেহ দুটি শনাক্ত করেন।
হত্যাকাণ্ডের শিকার জাহানারার স্বামী আমজাদ শেখ জানান, স্ত্রী ও সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তিনি হন্যে হয়ে তাদের খুঁজছিলেন। তদন্তের স্বার্থে পুলিশকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। আমজাদ জানান, ইটভাটায় কাজ করার সময় তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য এক ব্যক্তির পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলে তিনি জানতে পেরেছিলেন। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ইতিপূর্বে ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার কয়েকবার বাগ্বিতণ্ডা ও ঝামেলাও হয়। আমজাদ শেখের ধারণা, ওই সম্পর্কের জের ধরেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
নৃশংস এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ জানায়, মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, এখনই নিশ্চিতভাবে কোনো একক কারণকে দায়ী করা যাচ্ছে না। স্বামীর দাবি করা পরকীয়া সম্পর্কের বিষয়টি যেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে, তেমনই এর পেছনে অন্য কোনো পারিবারিক শত্রুতা বা আর্থিক বিরোধ রয়েছে কিনা—সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে প্রশাসন