
বেলাল হোসেন ঠাকুরগাঁও, প্রতিনিধিঃ
ঠাকুরগাঁওয়ে ঢাকাগামী একটি বাস থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া খুলনার মেয়ে মিলি আক্তারকে (১৮) অবশেষে তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর এই পুরো মানবিক ও রোমাঞ্চকর উদ্ধার অভিযানের মূল নায়ক হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা আনসার কোম্পানি কমান্ডার মো. আবুল কালাম আজাদ। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারটিকে খুলনা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে এনে মেয়ের মুখোমুখি করিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী থানায় মিলিকে তাঁর মা ও ভাইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২ জুলাই। রাত ১০টা বেজে ৬ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি গ্রুপ পোস্টের দিকে নজর যায় ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা আনসার কোম্পানি কমান্ডার মো. আবুল কালাম আজাদের। তিনি জানতে পারেন, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ী বাজারে ‘আনাস পরিবহন’ নামের একটি কোচ থেকে অচেতন অবস্থায় এক তরুণীকে উদ্ধার করে বালিয়াডাঙ্গী থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। মেয়েটির বাড়ি খুলনা জেলায় এতটুকু তথ্য জানতে পেরেই তাৎক্ষণিক অ্যাকশনে নামেন আনসার কমান্ডার আবুল কালাম আজাদ।
তিনি কালক্ষেপণ না করে খুলনা জেলার উপজেলা প্রশিক্ষক জনাব রাকিব এবং জেলা কমান্ড্যান্ট মিনহাজ আরেফিনকে বিষয়টি অবহিত করেন। তাঁদের সহায়তায় খুলনার আনসার-ভিডিপি সদস্যদের গ্রুপে তথ্যটি ছড়িয়ে দেওয়া হলে রাহাত নামে এক ওয়ার্ড লিডার মেয়েটির সঠিক পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হন।
মেয়ের পরিবারের সন্ধান মেলার পর কমান্ডার মো. আবুল কালাম আজাদ সরাসরি ভিডিও কলে মিলির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেন। মেয়েটিকে শতভাগ শনাক্ত করার জন্য তিনি তাঁর আইডি কার্ড এবং ছবি সংগ্রহ করেন। এরপর সংগৃহীত সব তথ্য ও প্রমাণ বালিয়াডাঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) অবগত করেন তিনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
উপজেলা আনসার কোম্পানি কমান্ডার মো. আবুল কালাম আজাদ, “সবকিছু মিলে যাওয়ার পর আমি পরিবারটিকে দ্রুত ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হতে বলি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায় খুলনা থেকে ঠাকুরগাঁও আসার মতো কোনো টাকা-পয়সা তাঁদের ছিল না।”
পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা শুনে বুক বাড়িয়ে দেন আনসার কমান্ডার আবুল কালাম। তিনি পরিবারটিকে আশ্বস্ত করে বলেন, “আপনারা যেকোনো উপায়ে ঠাকুরগাঁও এসে পৌঁছান, আপনাদের আসা-যাওয়ার ভাড়া এবং খাওয়া-দাওয়ার সম্পূর্ণ খরচ আমি নিজে বহন করব।”
কমান্ডারের এই আশ্বাসে ভরসা পেয়ে গত শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেল ৪টায় খুলনায় গাড়িতে ওঠে মিলির পরিবার। পথিমধ্যে সারাক্ষণ তাঁদের সাথে যোগাযোগ রেখে খোঁজখবর নেন আবুল কালাম আজাদ। অবশেষে আজ শনিবার সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে মিলির মা ও ভাই ঠাকুরগাঁও বাস টার্মিনালে এসে পৌঁছালে কমান্ডার আবুল কালাম আজাদ দুজন ভিডিপি সদস্যসহ তাঁদের সাদরে রিসিভ করেন।
পরবর্তীতে কমান্ডার মো. আবুল কালাম আজাদ তাঁর নিজস্ব গাড়িতে করে মিলির পরিবারকে নিয়ে বালিয়াডাঙ্গী থানায় হাজির হন। সেখানে বালিয়াডাঙ্গী থানার ওসির উপস্থিতিতে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মিলি আক্তারকে তাঁর মা ও ভাইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন পর নিখোঁজ মেয়েকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা।
ঠাকুরগাঁও আনসার ও ভিডিপির এই অভাবনীয় ও মানবিক সহায়তার জন্য উপজেলা আনসার কোম্পানি কমান্ডার মো. আবুল কালাম আজাদ এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর প্রতি হাত জোড় করে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান মিলির পরিবার।