
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সংরক্ষিত নারী আসন ঘিরে ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষা থাকলেও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মুখে এখন সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে জেলা মহিলাদলের সভাপতি ফোরাতুন নাহার প্যারিসের নাম। দীর্ঘদিনের ত্যাগ, আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে তাকে সংরক্ষিত নারী আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
রাজপথের আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন দুই অঙ্গনের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বগুণের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে তার রাজনৈতিক পরিচিতি। দলের দুর্দিনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা, সংগঠনকে সুসংগঠিত রাখা এবং নারী নেত্রীদের একত্রিত করার ক্ষেত্রে তার অবদান তাকে জেলার রাজনীতিতে আলাদা অবস্থান এনে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নানা চাপ, হামলা ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তিনি মহিলাদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ফোরাতুন নাহার প্যারিসের জন্ম পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের রামপুর গ্রামে একটি সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারে। তিনি রুহিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মো. ইউনুস আলীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের পর ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন এবং রংপুর সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন। দুই সন্তানের জননী তিনি পেশায় একজন স্কুলশিক্ষিকা। সংসার, শিক্ষকতা ও রাজনীতি এই তিন ক্ষেত্র সামলে নিজেকে একজন সংগ্রামী নারী নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
কলেজ জীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। ১৯৯৩ সালে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তৎকালীন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সামাউল হক সামু চৌধুরী, জেলা মহিলাদলের তৎকালীন সভাপতি জাহানারা বেগম (লাল চাচী) এবং সাধারণ সম্পাদক বেগম এহিয়া রউফের হাত ধরে বিএনপিতে যোগদান করেন। পরে তাকে সভাপতি করে মহিলাদলের একটি থানা কমিটি গঠন করা হয়। এরপর থেকেই তিনি দলের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
২০১০ সালে জেলা মহিলাদলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, হামলা ও হয়রানির মুখেও সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে সরে যাননি। ২০১৭ সাল থেকে বর্তমানে জেলা মহিলাদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে তিনি বিভিন্ন সময়ে চাকরিজীবনে হয়রানির শিকার হন। তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী সদ্য প্রয়াত রমেশ চন্দ্র সেনের সময়কালেও নানা রাজনৈতিক চাপ ও বাধার মুখে পড়েন। কর্মস্থলে প্রশাসনিক চাপ এবং নেতাকর্মীদের মাধ্যমে হয়রানি উপেক্ষা করেও সভা-সমাবেশে প্রতিবাদী বক্তব্য দিয়ে সংগঠনের পক্ষে অবস্থান বজায় রাখেন। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তার পরিবারও নানা চাপের মুখে পড়ে। তার স্বামীর ছোট ভাই প্রফেসর সৈয়দ আলী ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েন এবং একপর্যায়ে ভাই-ভাবি বিএনপি রাজনীতি করার কারণে ওএসডি হন। একই সময়ে পারিবারিক জমি-সংক্রান্ত বিষয়েও নানা জটিলতা ও মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তার স্বামী সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইউনুস আলীর বিরুদ্ধে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে একটি মামলা করা হয়। এরপর কয়েক মাস আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। সেই সময় ফোরাতুন নাহার প্যারিসকেও আত্মগোপনে থাকতে হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে সরে যাননি। একই বছর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হন। ১ লাখ ৫৫ হাজার ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করেন। নির্বাচনে জয়লাভের পরও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে দায়িত্ব পালনে বাধা পান।
নেতাকর্মীরা জানান, ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাকে বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং বড় পদ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বিএনপির সঙ্গেই থেকে সংগঠনের নেতৃত্ব ধরে রেখেছেন।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির গণসমাবেশে অংশ নিতে গিয়ে আহত হন তিনি। এরপর অনেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে থাকলেও তিনি জেলা মহিলাদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে সংগঠনের কার্যক্রম সচল রাখেন এবং পুলিশি চাপ উপেক্ষা করে জেলা বিএনপির কার্যালয়ে গিয়ে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও ফোরাতুন নাহার প্যারিস ও জেলা মহিলাদলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজপথে নেতৃত্ব দেন তিনি। ৪ আগস্ট পুলিশ তার বাড়িতে গেলে তাকে না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করে। তবুও তিনি আন্দোলনের অবস্থান থেকে সরে যাননি।
জেলা বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের দুঃসময়ে রাজপথে থেকে সংগঠনকে ধরে রেখেছেন প্যারিস। তার সাহসী ভূমিকা ও সংগঠনের প্রতি নিষ্ঠা তাকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে আস্থাভাজন নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ফোরাতুন নাহার প্যারিস বলেন, ৩০ বছর ধরে আমি বিএনপির রাজনীতি করছি। দলের দুঃসময়ে রাজপথে থেকেছি। দল যদি আমাকে কোনো দায়িত্ব দেয়, সেটি সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করব। সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে আলোচনা দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। দল যাকে যোগ্য মনে করবে তাকেই দায়িত্ব দেবে। তবে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আমার নাম আলোচনায় আনছেন এ জন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। নারী নেতৃত্বকে আরও এগিয়ে নিতে এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ভবিষ্যতেও রাজপথে থেকে কাজ করে যেতে চান।