
আবুজার গাজী, খুলনা বিভাগ প্রধান।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দুর্গম উপকূলীয় ইউনিয়ন গাবুরায় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার ত্রাণ বিতরণ পদ্ধতি নিয়ে চরম ক্ষোভ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। পবিত্র রমজান উপলক্ষে খাদ্য সহায়তা বিতরণের নামে অসহায় নারী-পুরুষদের নদীর হাঁটু পানিতে দাঁড় করিয়ে রাখার ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি মানবিক সহায়তা, নাকি দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্য নিয়ে উপহাস?
শনিবার (১৪ মার্চ) সকালে গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনিমুখা এলাকায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্রতী’ (BRATI) পরিচালিত একটি ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিতে এমন দৃশ্য দেখা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উত্তর আমেরিকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন ‘নর্থ আমেরিকান বাংলাদেশি ইসলামিক কমিউনিটি’ (NABIC)-এর অর্থায়নে গাবুরা ইউনিয়নের প্রায় ৫০০ প্রান্তিক পরিবারের মাঝে পবিত্র রমজান উপলক্ষে খাদ্য প্যাকেজ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শনিবার সকাল ১০টা থেকে চৌদ্দরশি, চাঁদনিমুখা, ডুমুরিয়া ও চকবারা ঘাটসহ বিভিন্ন রিভার রুটে (নদীপথ) ট্রলারের মাধ্যমে এই ত্রাণ পৌঁছানোর কার্যক্রম শুরু করে সংস্থা ‘ব্রতী’।
তবে বিতর্কের সূত্রপাত হয় চাঁদনিমুখা এলাকায়। সেখানে দেখা যায়, ত্রাণ নিতে আসা সুবিধাভোগীদের নদীর হাঁটু পানিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। সংস্থার কর্মীরা ট্রলারে অবস্থান করে পানি থেকে উঠে আসা মানুষের হাতে ত্রাণের প্যাকেট তুলে দিচ্ছেন।
এই ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই সমালোচনার ঝড় ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রচারের নেশায় এবং ডোনারদের (দাতাগোষ্ঠী) দেখানোর জন্য ‘ফটো সেশন’ ও ‘ভিডিও ডকুমেন্টেশন’ করতে গিয়ে অসহায় মানুষদের এমন অবমাননাকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক সমাজকর্মী বলেন,
“মানুষগুলো অভাবী হতে পারে, কিন্তু তারা তো মানুষ। রমজান মাসে রোজা রেখে হাঁটু পানিতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ত্রাণ নেওয়াটা কোনোভাবেই মানবিক হতে পারে না। এটি পরিষ্কারভাবে ‘পাবলিক হিউমিলিয়েশন’ বা সামাজিক অবমাননা।”
ত্রাণ বিতরণের এই বিতর্কিত ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর শুরুতে অনেকেই এটি শীর্ষস্থানীয় সংস্থা ‘ব্র্যাক’-এর কার্যক্রম বলে ধারণা করেছিলেন। তবে অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই বিতর্কিত কার্যক্রমটির সাথে ব্র্যাকের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই; বরং এটি পরিচালনা করেছে ‘ব্রতী’ (BRATI) নামক সংস্থাটি।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি পাওয়া না গেলেও প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে, জোয়ারের পানি এবং ট্রলার থেকে সরাসরি ঘাটে নামার সমস্যার কারণে হয়তো দ্রুত ত্রাণ হস্তান্তরের জন্য এমন কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল। তবে সাধারণ মানুষ ও নাগরিক সমাজের দাবি—সুবিধাভোগীদের সম্মান রক্ষা করে ডাঙ্গায় কোনো নিরাপদ স্থানে এই বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা যেত।
উপকূলীয় এই জনপদে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মানবিক আচরণের প্রশ্নে এখন সচেতন মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এই ঘটনাটি।