
হাকিকুল ইসলাম খোকন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন–এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিসরের নথি প্রকাশ করেছে। এপস্টেইন সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বাধিক নথি প্রকাশ। শুক্রবার প্রকাশিত এসব নথির মধ্যে রয়েছে প্রায় ত্রিশ লাখ পৃষ্ঠা, এক লাখ আশি হাজার ছবি এবং প্রায় দুই হাজার ভিডিও। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাক্ষরিত আইনে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রায় ছয় সপ্তাহ পর এসব নথি জনসমক্ষে আনা হয়।খবর আইবিএননিউজ।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে নথি খোঁজা, যাচাই ও পর্যালোচনার পর আইন মেনে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত নথির মধ্যে রয়েছে এপস্টেইনের কারাগারে থাকার সময়কার বিস্তারিত তথ্য, তার মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত রিপোর্ট এবং কারাবন্দি অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত নথি। পাশাপাশি, তার সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল–এর বিরুদ্ধে পরিচালিত তদন্তের নথিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারে এপস্টেইনকে সহায়তার দায়ে ম্যাক্সওয়েল দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।
নতুন প্রকাশিত নথিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম এসেছে কয়েক শতবার। এপস্টেইনের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল—এ কথা ট্রাম্প স্বীকার করলেও তিনি দাবি করেছেন, সেই সম্পর্ক বহু বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে এবং এপস্টেইনের যৌন অপরাধ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। নথিতে এফবিআইয়ের তৈরি একটি তালিকাও রয়েছে, যেখানে ন্যাশনাল থ্রেট অপারেশন সেন্টারের কলসেন্টারে ফোন করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে করা বিভিন্ন অভিযোগ সংরক্ষিত ছিল। তবে বিচার বিভাগের মতে, এসব অভিযোগের অনেকগুলোই যাচাই না করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা এবং সেগুলোর পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ পর্যন্ত এপস্টেইনের কোনো ভুক্তভোগী ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অপরাধের অভিযোগ করেননি।
এই বিষয়ে হোয়াইট হাউস ও বিচার বিভাগ নতুন নথির সঙ্গে প্রকাশিত এক বিবৃতির দিকে ইঙ্গিত করেছে। বিচার বিভাগের বিবৃতিতে বলা হয়, কিছু নথিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত অভিযোগ রয়েছে, যেগুলো ২০২০ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে এফবিআইয়ের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। যদি এসব অভিযোগের সামান্য বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকত, তাহলে অনেক আগেই সেগুলো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হতো।
প্রকাশিত নথিতে বিল গেটস–কে ঘিরেও বিতর্কিত দাবি উঠে এসেছে। সেখানে তাকে যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ করা হয়। এ বিষয়ে বিল গেটসের একজন মুখপাত্র অভিযোগগুলোকে একেবারেই হাস্যকর ও সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে মন্তব্য করেছেন। নথিতে থাকা ২০১৩ সালের দুটি ই-মেইল এপস্টেইনের লেখা বলে মনে হলেও সেগুলো আদৌ গেটসকে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। ই-মেইলগুলো স্বাক্ষরবিহীন এবং সেখানে বিল গেটস বা তার ফাউন্ডেশনের কোনো ই-মেইল ঠিকানা পাওয়া যায়নি। একটি ই-মেইলে বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে পদত্যাগপত্রের মতো লেখা এবং রুশ নারীদের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগও রয়েছে, যেগুলোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই।
নথিতে ব্রিটিশ অভিজাত মহলের সঙ্গে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে। সেখানে ‘দ্য ডিউক’ নামে একজন ব্যক্তির সঙ্গে এপস্টেইনের ই-মেইল যোগাযোগের উল্লেখ রয়েছে, যাকে ধারণা করা হয় তিনি প্রিন্স অ্যান্ড্রু। এসব ই-মেইলে গোপন ডিনারের পরিকল্পনা এবং ২৬ বছর বয়সী এক রুশ নারীর সঙ্গে পরিচয় করানোর প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে। ই-মেইলগুলো ২০১০ সালের, যা এপস্টেইনের দোষ স্বীকারের দুই বছর পরের ঘটনা। যদিও এসব ই-মেইলে কোনো অপরাধের সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও এপস্টেইনের সঙ্গে অতীত বন্ধুত্বের কারণে প্রিন্স অ্যান্ড্রু দীর্ঘদিন ধরেই তদন্ত ও সমালোচনার মুখে রয়েছেন। তিনি অবশ্য বরাবরই সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
সব নথি প্রকাশের মাধ্যমে এপস্টেইন সংক্রান্ত বিষয়টি এখানেই শেষ হলো কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চের বক্তব্য অনুযায়ী, যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় বিচার বিভাগের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে ডেমোক্র্যাটদের দাবি, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই এখনও প্রায় আড়াই লাখ নথি প্রকাশ করা হয়নি। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রোহ খানা বলেন, বিচার বিভাগ জানিয়েছে তারা ছয় মিলিয়নের বেশি পৃষ্ঠা শনাক্ত করেছিল, কিন্তু যাচাই ও কাটছাঁটের পর প্রকাশ করা হয়েছে মাত্র সাড়ে তিন মিলিয়ন পৃষ্ঠা। ফলে এপস্টেইন নথি নিয়ে বিতর্ক আপাতত শেষ হচ্ছে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা