
স্টাপ রিপোর্টার।।
ভূমি দখল, ঋণ অনিয়ম ও আর্থিক প্রতারণার একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব আলী আফজালকে নিয়ে দেশের শীর্ষ আবাসন সংগঠন রিহ্যাবে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আবাসন খাতের অন্যতম প্রধান সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর আসন্ন নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন ও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামের দীর্ঘ সময়ের স্পন্সর ও ডোনার হিসেবে খ্যাত কৃষিবিদ গ্রুপের আলী আফজাল। রিহ্যাবের সভাপতি পদে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জামায়াতের মাস্টার মুভ বলে মনে করছেন অনেকেই। তারা বলছেন, এবার আবাসন খাত দখলের পায়তারা করছে জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী একজন চরম বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিয়ে আবাসন খাতে কর্তৃত্ব স্থাপনের উদ্যোগকে সংশ্লিষ্টরা সমালোচনা করছেন।
শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির অভিযোগ
আলী আফজাল দেশের শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারিতে ধরা পড়েন। বিপুল অর্থের বিনিময়ে কেলেঙ্কারি থেকে নিজেকে রক্ষা করার অপচেষ্টা করেন তিনি। ২০২১ সালে কৃষিবিদ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কৃষিবিদ ফিড লিমিটেড বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে মুনাফা অতিরঞ্জিত দেখানোর মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অযোগ্য ঘোষিত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে রিপোর্ট করিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করা হয়। এতে হাজার হাজার মানুষ ভুল রিপোর্ট দেখে তাদের শেয়ার ক্রয় করে; ফলে তারা নিঃস্ব হয়ে যায়। স্ক্যাম করে শত কোটি টাকা লুটপাট করে কৃষিবিদ গ্রুপ। আলী আফজালের প্রতারণার কবলে পড়ে এভাবেই শত শত মানুষ সে সময় নিঃস্ব হয়ে যায়।
ঋণখেলাপি ও অপতৎপরতায় পুনঃতফসিল
আলী আফজাল ও কৃষিবিদ গ্রুপ আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, আইআইডিএফসি এবং আইপিডিসি ফাইন্যান্সসহ আটটি ব্যাংক ও দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণখেলাপি হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এক উপপরিচালক যিনি শিবিরের সাবেক নেতা ছিলেন তার প্রচেষ্টায় ৬০০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করান আলী আফজাল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) কর্তৃক ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তারিখে জারি করা এক পরিপত্র অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা কোনো ধরনের নীতিগত সহায়তার জন্য যোগ্য হবেন না। অভ্যন্তরীণ নথি থেকে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছর মেয়াদে কৃষিবিদ গ্রুপের নেওয়া প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করার জন্য ঋণদাতাদের নির্দেশ দিয়েছে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউন পেমেন্ট করা হলে গ্রুপটির ইচ্ছাকৃত খেলাপি তকমা প্রত্যাহার করতেও ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে। নির্দেশনাগুলো তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের অনুমোদনক্রমে জারি করা হয়েছিল। এসব কাজে জামায়াতের হাই কমান্ডের তদবির ছিল আলী আফজালের পক্ষে।
বন বিভাগের জমি দখলসহ অন্যান্য অভিযোগ
কৃষিবিদ গ্রুপ ও আলী আফজালের সাধারণ মানুষের টাকা লুটপাট করার ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। আলী আফজাল ও তার সহযোগীরা রাষ্ট্রীয় জমি নিজেদের দখলে নিয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাৎ করে। বন বিভাগের মালিকানাধীন জমি জাল দলিলের মাধ্যমে বিক্রি করে এই আলী আফজাল। এ বিষয়ে মামলা হলে মামলার বাদীকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় আলী আফজালের পোষা গুন্ডাবাহিনী।
জামায়াতের ধর্মীয় রাজনীতির মুখোশে আলী আফজালের এই লুটপাট, স্থানীয় নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনাগুলো অন্ধকার আড়ালে ঢাকা পড়ে। ২০২১ সালে এই অভিযোগে কালিয়াকৈর রেঞ্জ অফিসার শহীদুল আলম আদালতে মামলা দায়ের করেন কৃষিবিদ সিটি প্রকল্পের বিরুদ্ধে। এছাড়াও, সাভার ও আশপাশের এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে কৃষিবিদ গ্রুপের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—রাতের আঁধারে গাছ কেটে জমি সমান করে নেওয়া হয়, জমির মালিকদের প্রবেশ করতেও দেওয়া হয় না। স্থানীয়দের ওপর এই নির্যাতনের ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না।
শিক্ষায় প্রতারণা ও জালিয়াতি
কৃষিবিদ গ্রুপের ‘কৃষি ফাউন্ডেশন’ দ্বারা পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘গ্লোরিয়াস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেধড়ক মারধর; বছরের পর বছর ধরে বেতন আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক অধ্যক্ষ জোবায়ের হাসান বলেন—মাসের পর মাস বেতন আটকে রেখে শিক্ষকদের পারিশ্রমিক না দিয়ে প্রতারণা করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় দখলের অপতৎপরতা
২০২৪ সালে কৃষিবিদ গ্রুপ তাদের নিজেদের গাড়ির বহর নিয়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা করে। হামলাকারীরা যৌথবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে অভিযুক্ত আসামিদের রিমান্ডে নিলে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আলী আফজালের নাম বের হয়ে আসে। এর আগে অবৈধভাবে ওই বিশ্ববিদ্যালয়টি দখলের পাঁয়তারা হিসেবে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিকে হাতিয়ার করে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করান এই আলী আফজাল। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় দখলের অপচেষ্টার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জোবায়েরকে কয়েক কোটি টাকা ঘুষ দেন আলী আফজাল। বিষয়টি জানাজানি হলে শিক্ষা সচিবকে প্রত্যাহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—আলী আফজালের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তিনি আরও আগ্রাসী হয়ে উঠছেন।
এদিকে রিহ্যাব নেতৃবৃন্দকে আসন্ন নির্বাচনে ঋণখেলাপি, প্রতারক আলী আফজালের মনোনয়নে আইনি অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তারা জানান—এ বিষয়টি তারা নির্বাচন-পূর্ববর্তী মিটিংয়ে চূড়ান্ত করবেন। তবে, কাউকেই অনৈতিক সুযোগ প্রদান করা হবে না। এই অ্যাসোসিয়েশনকে দলীয়করণের সুযোগ নেই।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর দুর্নীতিসহ সব ধরনের অনিয়ম ও অপকর্মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ভূমিখেকো আলী আফজালের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে বলে নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট মহল স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, দুর্নীতি, ভূমি দখল, আর্থিক অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না; দল-মত নির্বিশেষে তাদের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।