মোহাম্মদ হোসাইন, স্টাফ রিপোর্টার,টেকনাফ, কক্সবাজার
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চল সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও শাহপরীর দ্বীপ দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ ভাঙনের মুখে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাবে প্রতিবছরই দ্বীপ দুটির বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দ্বীপ দুটিকে রক্ষায় দ্রুত টেকসই পাথরের ক্রস বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশ সচেতন ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
স্থানীয়দের মতে, ১৯৯১ সালের পর থেকে প্রতি বর্ষা মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং অস্বাভাবিক উচ্চতার ঢেউয়ের আঘাতে সেন্ট মার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপের উপকূল ক্রমাগত ভেঙে যাচ্ছে। বিশেষ করে শাহপরীর দ্বীপের বিভিন্ন অংশে ভাঙন আশঙ্কাজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে দ্বীপটির বড় একটি অংশ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, সেন্ট মার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান এবং মাটির গঠন তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় প্রবল স্রোত ও ঢেউয়ের আঘাতে উপকূল দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শাহপরীর দ্বীপ নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বেশি। অন্যদিকে, সেন্ট মার্টিনের প্রবালভিত্তিক প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও নানা কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
পরিবেশবিদরা আরও বলেন, উপকূল রক্ষাকারী প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে পরিচিত কেয়া বন ও ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ভাঙনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময় এসব বনাঞ্চল ঢেউয়ের শক্তি কমিয়ে উপকূলকে সুরক্ষা দিত। কিন্তু বন উজাড় ও পরিবেশগত ক্ষতির কারণে বর্তমানে ঢেউ সরাসরি তীরভূমিতে আঘাত হানছে, ফলে উপকূল ক্ষয়ের হার দ্রুত বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের দাবি, অস্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দিয়ে আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় টেকসই পাথরের ক্রস বেড়িবাঁধ নির্মাণ, উপকূলীয় বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার, কেয়া ও ম্যানগ্রোভ বনায়ন সম্প্রসারণ এবং আধুনিক উপকূল সুরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ বিষয়ে সামাজিক কর্মী ও সাংবাদিক নজরুল ইসলাম খোকন বলেন,
"সেন্ট মার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপ শুধু স্থানীয় জনগণের আবাসস্থল নয়, এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক, পরিবেশগত ও পর্যটন সম্পদ। উপকূল ভাঙন রোধে দ্রুত টেকসই পাথরের ক্রস বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং সমন্বিত উপকূল রক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।"
তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপাঞ্চলকে রক্ষা করতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে সেন্ট মার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশের এই অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষিত থাকবে।