নিজস্ব প্রতিবেদক
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা এখন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবলে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের তথাকথিত ‘স্বেচ্ছাসেবক ইনচার্জ’ এস কে ইসলামুল হোসেন জজ-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই চক্রটির বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ লুট, ওষুধ পাচার এবং সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স চালকদের জিম্মি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে এবং মাসিক মাসোহারা নিশ্চিত করতে সাধারণ চালকদের ওপর চুরির অপবাদ দিয়ে তাদের কর্মবিরতিতে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানী টিমের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে হাসপাতালের অভ্যন্তরে এক ভয়াবহ লুটপাটের চিত্র উঠে এসেছে। কালিগঞ্জ উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা এস কে ইসলামুল হোসেন জজ স্বেচ্ছাসেবকের আড়ালে সেখানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন।
হাসপাতালের পরিত্যক্ত ভবনের গ্রিল, লোহার বেড এবং কেবিনের গেট খুলে রাতের আঁধারে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রত্যক্ষদর্শী চালকরা জানান, ভোরবেলা যখন তারা গাড়ি পরিষ্কার করেন, তখন জজ ও তার সহযোগীদের এসব সরঞ্জাম সরাতে দেখেছেন। প্রতিবাদ করলেই মেলে ‘চুরির মামলায়’ ফাঁসানোর হুমকি।
হাসপাতালের নথিতে নাইট গার্ড হিসেবে নিতেশের নাম থাকলেও, তিনি দীর্ঘদিন ডিউটি করেন না। তার পরিবর্তে দায়িত্ব পালন করেন তার ভাই নয়ন। অভিযোগ রয়েছে, এই দুই ভাই ও জজ মিলে দিনের দুপুরে হাসপাতালের পুকুর থেকে মাছ এবং বাগান থেকে নারকেল পাচার করেন। সম্প্রতি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক আরাফাত হোসেন এই লুটপাটের ভিডিও করার চেষ্টা করলে তাকে মিথ্যা চুরির অপবাদে ফাঁসানোর ষড়যন্ত্র করা হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, সরকারি ডাক্তার ও নার্সদের অনুপস্থিতিতে বা অবহেলায় অনেক সময় জজের অধীনে থাকা অদক্ষ স্বেচ্ছাসেবকরাই রোগীদের জরুরি ট্রিটমেন্ট দিচ্ছেন। সম্প্রতি নার্সদের দায়িত্বহীনতার একটি ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর হাসপাতালের ভেতরের এই সমন্বয়হীনতা প্রকাশ্যে আসে।
অ্যাম্বুলেন্স চালক কল্যাণ সমিতির নেতারা অভিযোগ করেন, জজ ও তার সিন্ডিকেট প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে মাসিক ২,০০০ টাকা হারে চাঁদা দাবি করে আসছে। এই চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এবং তাদের অপকর্মের সাক্ষী হওয়ায় চালকদের চোর সাব্যস্ত করে স্থানীয় কিছু অসাধু সাংবাদিককে দিয়ে ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ করানো হয়েছে। চালক মোঃ আনিসুর রহমান জানান, চালকরা রাতে হাসপাতালে অবস্থান করায় জজের সিন্ডিকেট তাদের ‘কাঁটা’ মনে করছে এবং তাদের বিতাড়িত করে হাসপাতালের একাধিপত্য নিতে চাইছে।
"আমরা জীবন বাঁচাতে লড়ি, আর জজ লড়ে হাসপাতালের সম্পদ লুটতে। সরকারি সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে আজ আমরাই অপরাধী সাজছি।" — ক্ষুব্ধ এক অ্যাম্বুলেন্স চালক।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ খালেদুর রহমান বলেন, "হাসপাতালের মতো পবিত্র স্থানে কোনো অপরাধী চক্রের স্থান হবে না। সাংবাদিকতার নামে অপপ্রচার বা সরকারি সম্পদ চুরির প্রতিটি অভিযোগ আমরা খতিয়ে দেখছি। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
বর্তমানে এই সিন্ডিকেটের কারণে হাসপাতালের সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সাধারণ মানুষের দাবি, অবিলম্বে এই তথাকথিত ‘স্বেচ্ছাসেবক সিন্ডিকেট’ উচ্ছেদ করে প্রকৃত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হোক এবং সরকারি সম্পদ রক্ষায় কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হোক।