মোঃ মেহেদী হাসান, সম্পাদক ও প্রকাশক
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে স্কুলছাত্রী নিখোঁজের চাঞ্চল্যকর ঘটনার মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালিয়ে চার ছাত্রীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে শ্যামনগর থানা পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বেলা ১১টায় থানায় জিডি হওয়ার পর, গভীর রাতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাখিমারা গ্রাম থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। স্কুল ফাঁকি দিয়ে পার্কে ঘোরার কারণে পারিবারিক বকাঝকার জেরে এই চার ছাত্রী একযোগে খুলনায় পালিয়ে গিয়েছিল বলে পুলিশি অনুসন্ধানে জানা গেছে।
তড়িৎ পদক্ষেপ নিয়ে নিখোঁজের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চার কিশোরীকে নিরাপদে উদ্ধার করায় এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে। সন্তানদের অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেয়ে অভিভাবকরা শ্যামনগর থানা পুলিশের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
পারিবারিক ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আব্দুল হালিম গাজীর মেয়ে মোছা. আশামনি (১৬), মো. মুত্তাসিনের মেয়ে মোছা. দিঘি ইসলাম (১৬), মো. আজমলের মেয়ে মোছা. আজমিরা এবং মো. অহিদুল ইসলামের মেয়ে মোছা. ছামিয়া প্রতিদিনের মতো স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। তারা সবাই স্থানীয় নওয়াবেঁকী ছবিরুন্নেছা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
স্কুল ছুটির পরও তারা বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে ব্যর্থ হয়ে ওই দিন বেলা ১১টার দিকে তাদের অভিভাবকরা শ্যামনগর থানায় পৃথক চারটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। থানায় রুজুকৃত জিডি নম্বরগুলো হলো যথাক্রমে ১০৮১, ১০৮২, ১০৮৩ এবং ১০৮৪।
পুলিশের ঝটিকা অভিযান জিডি নথিভুক্ত হওয়ার পর পরই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. খালেদুর রহমান। তার নির্দেশে ও প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এসআই সজীব ও এএসআই সুজনসহ থানার একটি চৌকস ও বিশেষ টিম তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে নামে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিখোঁজ হওয়ার দিন দুই-চার আগে ওই চার ছাত্রী বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নে অবস্থিত ‘আকাশ নীলা ইকোপার্কে’ ঘুরতে গিয়েছিল। স্কুল চলাকালীন সেখানে ঘোরাঘুরি করার সময় স্থানীয় কিছু ছেলে তাদের আটকে দেয় এবং বিষয়টি মোবাইল ফোনে তাদের পরিবারকে জানায়। পরবর্তীতে তারা বাড়িতে ফিরলে পরিবারের সদস্যরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বকাঝকা করেন।
অভিমান করে ঘটনার দিন (বৃহস্পতিবার) তারা স্কুলে যাওয়ার নাম করে একযোগে সাতক্ষীরা হয়ে খুলনায় পালিয়ে যায়। খুলনায় গিয়ে তারা এক অপরিচিত ভালো মানুষের শরণাপন্ন হয় এবং তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দিতে বলে। ওই ব্যক্তি মেয়েদের কথাবার্তায় সন্দেহ প্রকাশ করে এবং তাদের প্রকৃত পরিচয় ও সংকটের কথা বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি শ্যামনগর থানার ওসিকে অবহিত করেন।
খবর পেয়ে ওসির নির্দেশনায় পুলিশ টিম দ্রুত সাতক্ষীরার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এদিকে ওই সহৃদয় ব্যক্তি মেয়েদের একটি মাইক্রোবাসে তুলে সাতক্ষীরার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন। তবে ছাত্রীরা অত্যন্ত চতুরতার পরিচয় দিয়ে মাঝপথেই তাদের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে। তারা সাতক্ষীরা সদরে না নেমে কৌশলে আবার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাখিমারা গ্রামে তাদের এক সহপাঠী ও বান্ধবী মোছা. ছনিয়ার বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
মেয়েরা বারবার অবস্থান পরিবর্তন করলেও দমে যায়নি শ্যামনগর থানা পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ এসআই সজীব মেয়েদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ট্র্যাক করা শুরু করেন। দীর্ঘ নিখুঁত অনুসন্ধানের পর রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বান্ধবী ছনিয়ার বাড়ি থেকে চার ছাত্রীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। উদ্ধারকৃত ছাত্রীদের রাতেই থানা হেফাজতে নেওয়া হয় এবং আজ (শুক্রবার) দুপুরে আইনি প্রক্রিয়া (জিডি মূলে) সম্পন্ন করে তাদের নিজ নিজ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
শ্যামনগর থানায় অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. খালেদুর রহমান যোগদানের পর থেকেই একের পর এক অসাধ্য সাধন করে চলেছেন। তার মানবিক ও দক্ষ নেতৃত্বে থানা পুলিশ এখন প্রকৃত অর্থেই জনগণের বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। কিছুদিন আগেও তার সুনিপুণ দিকনির্দেশনায় আরেকটি নিখোঁজ মেয়েকে দ্রুততম সময়ে উদ্ধার করেছিল পুলিশ।
বর্তমান ওসির নেতৃত্বে এসআই এবং এএসআইসহ পুরো ফোর্স রাত-দিন কাজ করে মাদক ও অপরাধ দমনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আইনি সেবা পৌঁছে দিচ্ছে, যা সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। এই অভিযানে অংশ নেওয়া সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত চৌকস কর্মকর্তা এএসআই সুজন এবং তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতায় পারদর্শী এসআই সজীবের কার্যকারী ভূমিকা পুলিশের পেশাদারিত্বকে আরও উজ্জ্বল করেছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন বিনোদন পার্কে আড্ডা ও অনৈতিক ঘোরাঘুরি বন্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছে শ্যামনগর থানা পুলিশ।
শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. খালেদুর রহমান স্পষ্ট বার্তায় জানান, "তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় স্কুল চলাকালীন সময়ে কোনো স্কুল বা কলেজের ছাত্র-ছাত্রী কোনো বিনোদন পার্ক বা ইকো-পার্কে প্রবেশ করতে পারবে না।"
তিনি আরও জানান, মাদক, কিশোর গ্যাং এবং পার্কগুলোতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পুলিশ সর্বদা কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এলাকাকে অপরাধমুক্ত ও শান্ত রাখতে পুলিশের এই ঝটিকা অভিযান ও নজরদারি আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।