ফারুক হোসাইন, শ্যামনগর উপজেলা প্রতিনিধি।
সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলা“খাল হবে জনতার অধিকার”—মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই জনবান্ধব অঙ্গীকার যখন দেশজুড়ে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত, ঠিক তখন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় দেখা গেছে এর উল্টো চিত্র। জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষিজমি রক্ষার দাবি জানাতে গিয়ে উল্টো মামলার জালে ফেঁসে এখন শ্রীঘরে দিন কাটছে শতাধিক প্রান্তিক কৃষকের।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের কুলতলি খালটি ঘিরেই এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, মূলত কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং হতদরিদ্র মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে মাছ আহরণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারিভাবে এই খালটি খনন করা হয়েছিল।
কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখল ও নেট-পাটা দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি সরতে না পেরে ইউনিয়নের হাজার হাজার বিঘা কৃষি জমি তলিয়ে থাকছে। এতে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ায় চরম অর্থনৈতিক ও খাদ্য সংকটের মুখে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
খালটি দখলমুক্ত করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবিতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শত শত মানুষ আন্দোলন করে আসছেন। তারা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে গণস্বাক্ষর সংবলিত স্মারকলিপি জমা দেন। কৃষকদের দাবি ছিল—প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে খালটি প্রভাবশালীদের দখলমুক্ত করা।
তবে পরিস্থিতির মোড় ঘোরে গত ০৮/০৪/২০২৬ তারিখে। অভিযোগ উঠেছে, খাল উদ্ধারের দাবিতে সোচ্চার হওয়া কৃষকদের স্তব্ধ করতে শ্যামনগর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও অনেককে অজ্ঞাতনামা আসামি করে এই মামলাটি সাজানো হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।
মামলার বিবরন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই মামলায় রেহাই পাননি অশীতিপর বৃদ্ধরাও। অনেক বৃদ্ধ কৃষকের আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে তাদের মামলার আসামি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশি অভিযানে বেশ কিছু কৃষককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ফলে পুরো মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নে বর্তমানে পুরুষশূন্য অবস্থা বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরাও প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রভাবশালী মহলের ইশারায় তথ্য সংগ্রহে বাধা প্রদান এবং সাংবাদিকদের নানাভাবে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। এতে করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সত্য প্রকাশের অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কেন একটি সরকারি খাল প্রভাবশালীদের দখলে থাকবে? সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, “অধিকার চাইতে গিয়ে যদি কৃষককে কারাগারে যেতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের যাওয়ার জায়গা কোথায়?”
দায়েরকৃত মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
গ্রেপ্তারকৃত নিরীহ কৃষকদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।
কুলতলি খাল থেকে নেট-পাটা ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করতে হবে।
শ্যামনগরের এই ঘটনাটি এখন কেবল স্থানীয় ইস্যু নয়, বরং তা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।