আলমগীর হোসেন, রিপোর্ট
ঢাকা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, উৎপাদন খাত ও পণ্য সরবরাহ চেইনের (Supply Chain) মূল চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও চরম বৈষম্য, আইনি সুরক্ষাহীনতা এবং করপোরেট শোষণের শিকার হচ্ছেন দেশের প্রায় ২৮ লাখ বিক্রয় প্রতিনিধি (Sales Representatives)। দেশের প্রায় প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট সরকারি শ্রম নীতিমালা ও আইনি কাঠামো থাকলেও, দেশের অন্যতম বৃহত্তম এই শ্রমজীবী কর্মীবাহিনীর সুরক্ষায় কোনো কার্যকর রাষ্ট্রীয় নীতিমালা নেই। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রম আইন (ILO) ও দেশীয় শ্রম আইনের তোয়াক্কা না করে বহুজাতিক ও দেশীয় কোম্পানিগুলো এই বিশাল জনবলকে নামমাত্র মজুরিতে তীব্র শ্রম শোষণের মুখোমুখি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই বৈষম্যমূলক বাস্তবতায় শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সংগঠনের আইনি স্বীকৃতির (রেজিস্ট্রেশন) দাবিতে 'বাংলাদেশ বিক্রয় প্রতিনিধি জোট' কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া মাঠপর্যায়ের কর্মীরা অভিযোগ করেন, রোদ-বৃষ্টি-ঝড় কিংবা তীব্র দাবদাহ উপেক্ষা করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি দোকানে কোম্পানির পণ্য পৌঁছে দেন তারা। অথচ এই সেক্টরের কর্মীরা দেশের প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী ন্যূনতম মানবিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত।
বক্তারা জানান, মহান শহীদ দিবস (২১শে ফেব্রুয়ারি), স্বাধীনতা দিবস (২৬ শে মার্চ), আন্তর্জাতিক মে দিবস (১লা মে), বিজয় দিবস (১৬ই ডিসেম্বর) কিংবা পবিত্র শবে মেরাজ ও শবে কদরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও ধর্মীয় সাধারণ ছুটির দিনগুলোতেও তাদের বাধ্যতামূলকভাবে কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত রাখা হয়। বছরজুড়ে কোনো সাপ্তাহিক বা উৎসবকালীন ছুটি পান না তারা। কোনো কর্মী যদি তাঁর ন্যায্য ছুটি কিংবা অধিকারের বিষয়ে কথা বলতে যান, তবে বহুজাতিক ও দেশীয় করপোরেট কোম্পানিগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনো নোটিশ ছাড়াই সরাসরি চাকরিচ্যুতির (টার্মিনেশন) হুমকি দেন। কোনো আইনি সুরক্ষা বা সরকারি নীতিমালা না থাকায় কর্মীরা এই মানসিক ও আর্থিক নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সমাবেশে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এফএমসিজি (FMCG), ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী খাতের এই বিশাল সেক্টরটি থেকে রাষ্ট্র প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভ্যাট ও রাজস্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এই অভ্যন্তরীণ রাজস্বের চাকা সচল রাখছেন, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র এখনো উদাসীন।
সংগঠনটিকে একটি সুশৃঙ্খল আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে সংগঠনের সরকারি নিবন্ধনের (রেজিস্ট্রেশন) জন্য বিগত সরকার এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে বারবার ঘুরেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা ঝুলে রয়েছে। এর আগে একাধিকবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে রাজপথে নামলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস মেলেনি। ফলে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন দেশের এই অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক যোদ্ধারা।
"যে সেক্টর রাষ্ট্রকে হাজার হাজার কোটি টাকা ভ্যাট দিচ্ছে, সেই খাতের ২৮ লাখ কর্মীর কোনো কর্মঘণ্টা, ন্যূনতম মজুরি বা ছুটির আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে না—তা কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রে চলতে পারে না। এটি স্পষ্টত মানবাধিকারের লঙ্ঘন।"
— মানববন্ধনে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ
কোম্পানিগুলো বিপুল লভ্যাংশ অর্জন করলেও কর্মীদের বিপদে এগিয়ে আসে না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কোনো সরকারি বা করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা না পেয়েও নিজেদের পারস্পরিক চাঁদা ও সহযোগিতায় মানবিকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে 'বাংলাদেশ বিক্রয় প্রতিনিধি জোট'। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে সংগঠনটি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে—বিশেষ করে কুমিল্লা জোনে—পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সড়ক ও কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় নিহত বা গুরুতর আহত বিক্রয় প্রতিনিধিদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে সংগঠনটি। এ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় পরিবারগুলোর মাঝে প্রায় ২০ লক্ষ টাকা অনুদান ও কল্যাণ তহবিল বিতরণ করা হয়েছে।
বিগত ২০২৪ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যখন মাঠপর্যায়ের কর্মীদের রক্ষায় উদাসীন ছিল, তখন এই সংগঠনটি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে। বন্যাদুর্গত ও পানিবন্দী হাজারো পরিবারের মাঝে নিজস্ব উদ্যোগে প্রায় ৪ লক্ষ টাকার জরুরি খাদ্যসামগ্রী ও ত্রাণ বিতরণ করে তারা।
মানববন্ধন শেষে আয়োজিত সমাবেশ থেকে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করে অবিলম্বে সংকট নিরসনে ৩ দফা দাবি পেশ করেন
'বাংলাদেশ বিক্রয় প্রতিনিধি জোট'-কে অবিলম্বে সরকারি ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রম বিধিমালা অনুযায়ী চূড়ান্ত রেজিস্ট্রেশন প্রদান করতে হবে।
২৮ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ, সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ন্যূনতম মজুরি কাঠামো এবং চাকরির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় সেলস পলিসি বা নীতিমালা করতে হবে।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অতি দ্রুত এই যৌক্তিক দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া না হলে আগামীতে দেশের প্রতিটি জেলা ও বিভাগীয় শহরে পণ্য সরবরাহ বর্জনসহ (সেলস লকডাউন) আরও কঠোর ও লাগাতার আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ মেহেদী হাসান,মোবাইল-০১৭৪৫-০৫৪৯৯৮
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত