নিজস্ব প্রতিনিধি
রাজশাহীর তানোর থানা মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের নথিপত্র যাচাই অভিযানের নামে সাধারণ চালকদের চরম হয়রানি, ‘মামলা বাণিজ্য’ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে একটি মূলধারার গণমাধ্যমের জেলা প্রতিনিধিকে লাঞ্ছিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফোনে কথা বলার সময় এক সংবাদকর্মীর মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া এবং পরবর্তীতে ট্রাফিক সার্জেন্টের রহস্যজনক নীরবতায় স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
একজন জেলা পর্যায়ের সংবাদকর্মীর সাথে পুলিশের এমন অপেশাদার আচরণের পর খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—“সাংবাদিকরাই যদি প্রকাশ্য রাস্তায় পুলিশের কাছে নিরাপদ না হন, তবে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হবে?”
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ‘দৈনিক সাতক্ষীরা দিগন্ত’ ও ‘ডিএসডি টিভি’র রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন তানোর থানার সামনে নিজের মোটরসাইকেলটি একপাশে রেখে ফোনে কথা বলছিলেন। এ সময় সেখানে কর্তব্যরত ট্রাফিক কনস্টেবল মো. মাহাবুর কোনো উসকানি ছাড়াই আচমকা সাংবাদিক আনোয়ারের দিকে ধেয়ে আসেন। "তুই ভিডিও করছিস" বলে বুক পকেট থেকে তার মুঠোফোনটি জোরপূর্বক কেড়ে নেন ওই কনস্টেবল।
সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন তাৎক্ষণিকভাবে নিজের পেশাগত পরিচয় দিয়ে বলেন, "ভাই, আমি কোনো ভিডিও করছি না, ফোনে কথা বলছি।" কিন্তু কনস্টেবল মাহাবুর তার কোনো যৌক্তিক কথাই শোনেননি, উল্টো চরম অশালীন, আপত্তিকর ও অবমাননাকর আচরণ (খারাপ ব্যবহার) করতে থাকেন।
পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে একজন জেলা প্রতিনিধিকে লাঞ্ছিত ও হেনস্তা করার পর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করতে এবং এর প্রতিকার চাইতে ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট নূর তাজুলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন ওই সার্জেন্টের ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একজন গণমাধ্যমকর্মী লাঞ্ছিত হওয়ার পরও ট্রাফিক সার্জেন্টের এমন উদাসীনতা ও রহস্যজনক নীরবতা পুলিশের পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সাংবাদিক লাঞ্ছিত হওয়ার এই খবর ছড়িয়ে পড়লে তানোর থানা এলাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তানোরের সচেতন মহল ও সাধারণ চালকেরা পুলিশের আচরণে চরম আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আইডি কার্ড বুকে ঝোলানো সংবাদমাধ্যমের জেলা প্রতিনিধির ওপরই যদি পুলিশ এভাবে চড়াও হয় এবং ফোন কেড়ে নেয়, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হবে? আমাদের তো মুখ খোলারই সাহস থাকবে না।"
তানোর থানার সামনে ট্রাফিক পুলিশের এই বিশেষ চেকপোস্ট মূলত সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ‘মামলা বাণিজ্যের’ আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
যেসব চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স, হালনাগাদ ট্যাক্স টোকেন ও ইন্স্যুরেন্সসহ সব ধরনের বৈধ নথিপত্র রয়েছে, তাদেরকেও কোনো না কোনো ঠুনকো অজুহাতে মোটা অঙ্কের মামলা দেওয়া হচ্ছে।
নথিপত্রে সামান্য ত্রুটি থাকলে বা পুলিশকে ‘খুশি’ করতে না পারলে গাড়ি সরাসরি জব্দ করে থানায় আটকে রাখা হচ্ছে। পরবর্তীতে পর্দার আড়ালে আর্থিক রফাদফা বা মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি লাল রঙের ‘আটক স্লিপ’ ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, জেলা প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেনকে লাঞ্ছিত ও হয়রানির প্রতিবাদে এবং ট্রাফিক পুলিশের দুর্নীতি-হয়রানির বিরুদ্ধে তানোরের স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সাংবাদিক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্ত কনস্টেবল মো. মাহাবুরকে প্রত্যাহার করে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এবং সার্জেন্ট নূর তাজুলের উদাসীনতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না হলে কঠোর আন্দোলনে নামবেন তারা।
এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।