নিজস্ব প্রতিবেদক,
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিস এখন দুর্নীতির নিরাপদ দুর্গে পরিণত হয়েছে। সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখানে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) মো. আবু সুফিয়ান এবং তার প্রধান সহযোগী ‘রাজমিস্ত্রি’ মনিরুল ইসলামের গড়ে তোলা এক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। নামজারি, ডিসিআর কাটা থেকে শুরু করে খাজনা আদায়—প্রতিটি ধাপে দালাল ছাড়া মিলছে না কোনো সেবা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রের প্রধান কারিগর মনিরুল ইসলাম (পিতা- কপিল উদ্দিন কাগচী)। একসময় সাধারণ রাজমিস্ত্রির কাজ করলেও বর্তমানে তিনি মুন্সিগঞ্জ ও ভেটখালি এলাকায় ‘ভূমি সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে তিনি ভূমি অফিস ছাড়াও সেটেলমেন্ট এবং সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দালালি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। মনিরুলের মাধ্যমে না গেলে নায়েব আবু সুফিয়ান সাধারণ মানুষের বৈধ কাগজও দিনের পর দিন আটকে রাখেন। সাংবাদিকরা অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরুল উল্টো টাকা লেনদেনের প্রস্তাব দিয়ে অফিসে ডাকার ধৃষ্টতা দেখান।
ভূমি অফিসের এই সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আবু সুফিয়ানের ব্যক্তিগত মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এমনকি খুদেবার্তা পাঠিয়েও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তার এই রহস্যজনক নীরবতা দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতাকে আরও জোরালো করছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আবু সুফিয়ানের দুর্নীতির রেকর্ড বেশ দীর্ঘ। এর আগে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও প্রধান সহকারীর স্বাক্ষর জালিয়াতির মামলায় তাকে গ্রেফতার করেছিল শ্যামনগর থানা পুলিশ। মামলার বাদী অ্যাডভোকেট আজিবর রহমানের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদকের তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ মেলায় আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, জেল থেকে বেরিয়ে এসে তিনি পুনরায় আরও শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা নিজ উপজেলায় দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। কিন্তু আবু সুফিয়ানের বাড়ি শ্যামনগর এলাকায় হওয়ায় তিনি প্রশাসনিক ধরাছোঁয়াকে তোয়াক্কা করছেন না। দীর্ঘ সময় একই এলাকায় থাকার সুবাদে তিনি এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, শ্যামনগর সদরে আবু সুফিয়ানের রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি, দামী প্রাইভেটকার এবং আড়াই লাখ টাকা মূল্যের মোটরসাইকেল। একজন নায়েব হয়ে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক তিনি কীভাবে হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের দাবি, আবু সুফিয়ানকে অবিলম্বে সাতক্ষীরা জেলার বাইরে বদলি করা না হলে এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। নিজ উপজেলায় দায়িত্ব পালন করার সুযোগ নিয়ে তিনি স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছেন। মুন্সিগঞ্জের সাধারণ মানুষ এই ‘নায়েব-দালাল’ সিন্ডিকেট থেকে মুক্তি পেতে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিভাগীয় কমিশনারের আশু হস্তক্ষেপ ও তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।