মোঃ মেহেদী হাসান,সম্পাদক ও প্রকাশক
ভোরের সূর্য ওঠার আগে আর গোধূলি বেলায় কিচিরমিচির কলতানে মুখরিত হয়ে উঠে পাহাড়-ঝরনা সবুজ প্রকৃতির রাণী খাগড়াছড়ির বন রেঞ্জ অফিসপাড়া। গাছ-গাছালির ডাল-পালাজুড়ে আবাসস্থল গড়া অগণিত ‘মদনা টিয়ার’ গ্রাম হিসেবে সবার কাছে এখন পরিচিত এ অফিসপাড়া। অন্যদিকে, নিরাপদ অভয়াশ্রম হওয়ায় এলাকাটি পরিণত হয়েছে টিয়াদের স্বর্গরাজ্য।
স্থানীয় পাখিপ্রেমি কিংবা সৌন্দর্য পিপাসু পর্যটকদের কাছে টিয়া গ্রামটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। শহরের প্রবেশদ্বারের বনরেঞ্জ অফিসপাড়ার সারি সারি গাছের ডালপালাজুড়ে থাকা দৃষ্টিনন্দন টিয়া পাখি দেখতে অনেকে ভিড় জমান।
প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে অফিসপাড়ার আকাশমণি, বট, পাকুড়, মেহগনি, জাম, জারুলসহ বড় গাছগুলোকে নিজেদের আশ্রয়স্থল বানিয়েছে মদনা বা লাল-বুক টিয়া। শিকারি বা অন্য কারও উৎপাত-উৎপীড়ন না থাকা এবং ফলফলাদির গাছ থাকায় জায়গাটি তাদের কাছে নিরাপদ ও প্রিয় আবাসস্থল।
স্থানীয়রা জানান, ভোর বেলায় তারা দলবদ্ধ হয়ে পাহাড়ে বিভিন্ন স্থানে বিচরণে চলে যায়। সন্ধ্যার আগে এসে আশ্রয় নেয় বন রেঞ্জ অফিসপাড়ার উঁচু গাছগুলোতে। গাছের শাখায় শাখায় রাতে অবস্থান করে তারা। সবুজ দেহ,বুকে লালরঙ এবং পালকে এক চিলতে হলুদ নিয়ে সুদর্শন লাল-বুকটিয়া। গাছে গাছে অগণিত টিয়ার এমন দুর্লভ দৃশ্য এবং পাখির অনিন্দ্য সুর-শব্দে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো এলাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন চাকমা বলেন, ‘প্রথম দিকে এত পাখি দেখে অবাক হতাম। এখন প্রতিদিনই দেখি। সন্ধ্যার সময় আর ভোরবেলায় এখানে দাঁড়ালে মনে হয় যেন কোনো পাখির অভয়ারণ্যে আছি। পাখিগুলো এখন এই এলাকার বাসিন্দা হয়ে গেছে।’
খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন জানান, টিয়া পাখিগুলো ১০ থেকে ১২ বছর ধরে এখানে বসবাস করছে। কেউ যাতে শিকার বা উৎপীড়ন করতে না পারে, সে জন্য সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা রয়েছে। পাখির খাদ্যের জন্য প্রায় ২০০ উদাল, গুটি জাম, বট, পাকুড়, আম, পেয়ারা ও ডেউয়া প্রভৃতি ফলদ গাছ রোপন করা হয়েছে। এসব ফল টিয়াদের খাদ্য। আর গাছগুলো তাদের আশ্রয়।
বায়ো-ডাইভার্সিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটি’সদস্য সমীর মল্লিক বলেন, ‘লোকালয়ের আশপাশে বড় শিকারি পাখির উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকায় টিয়াগুলো এখানে বেশি নিরাপদ বোধ করে। দিনে দূরে গেলেও সন্ধ্যায় নিরাপদ জায়গায় ফিরে আসা তাদের স্বাভাবিক আচরণ। টিয়া পাখি শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, তারা বীজ ছড়িয়ে বন বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশেরও ভারসাম্য রক্ষা করে। এরা পরিবেশ প্রকৃতির অলংকার।’
খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা বলেন, ‘মদনা টিয়া মূলত পাহাড়ি অঞ্চলের পাখি। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া সিলেট অঞ্চলে এদের দেখা যায়। এরা আকারে ৩৮ সে.মি পর্যন্ত হয়। লালচে পেট ছাড়া দেহ সবুজ। কাঁধ হলদে। মাথা ধূসর। চোখ হলুদ। চোখ থেকে কপাল পর্যন্ত কালো ব্যান্ড। বেগুনি -নীল লেজের আগা হলদে। পুরুষ টিয়ার চঞ্চুলাল। স্ত্রীর চঞ্চুর কালচে বাদামি। লাল-বুক টিয়া বা মদনা টিয়া ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইনে সংরক্ষিত প্রজাতি। মদনা বা লাল-বুক টিয়ার সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক পাহারার পাশাপাশি নতুন করে পাখির খাদ্য উপযোগী গাছ লাগিয়ে বন সৃজনের উদ্যোগ নিয়েছে বনবিভাগ। পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির জন্যই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের নিরাপদ রাখতে সার্বক্ষণিক স্পেশাল টিম পাহারায় থাকে।