নিজস্ব প্রতিবেদক,
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে দেনা-পাওনার অজুহাতে মো. হাফিজুর রহমান হাফিজ নামের এক স্থানীয় সাংবাদিককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে দিনদুপুরে নির্মম ও অমানুষিক নির্যাতন চালানোর খবর পাওয়া গেছে। নির্যাতনের একপর্যায়ে প্রাণে বাঁচতে ভুক্তভোগী সাংবাদিক ‘বাবা-মা’ ডেকে চিৎকার ও আকুতি-মিনতি করলেও মন গলেনি নির্যাতনকারীদের। উল্টো মারধরের মুখে জোরপূর্বক তার কাছ থেকে একটি সাজানো ‘স্বীকারোক্তি’ আদায় করা হয় এবং তা মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে রাখা হয়।
পরবর্তীতে জিম্মি অবস্থায় তাকে একটি ব্যাংকের শাখায় নিয়ে জোরপূর্বক চেকে সই করিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়। জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে ব্যাংক এলাকা থেকে অবরুদ্ধ অবস্থায় ওই সাংবাদিককে উদ্ধার করে।
আজ রবিবার (২৮ জুন) সকালে উপজেলার মৌতলা ইউনিয়নের পানিয়া গ্রাম এবং কালীগঞ্জ উপজেলা সদর এলাকায় চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিকের মা মোছাঃ সুফিয়া বেগম (৫৫) বাদী হয়ে স্থানীয় দুই বিএনপি কর্মীকে অভিযুক্ত করে কালীগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযুক্তরা হলেন— উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের মো. রফিকুল ইসলাম ওরফে রফুর ছেলে মো. সোহাগ (৩২) এবং পানিয়া গ্রামের মো. হামিদ মহাজনের ছেলে মো. ইব্রাহিম (৪০)।
থানায় দায়েরকৃত অভিযোগ ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, সাংবাদিক হাফিজুর রহমানের সাথে অভিযুক্তদের দীর্ঘদিন ধরে দেনা-পাওনা সংক্রান্ত বিরোধ ছিল। এর জেরে আজ সকাল আনুমানিক ৭:০০ ঘটিকার সময় হাফিজুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন অভিযুক্ত সোহাগ ও ইব্রাহিম কৌশলে তাদের পানিয়া গ্রামের বাড়িতে প্রবেশ করে। সেখানে দেনা-পাওনা নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে কৌশলে হাফিজুর রহমানকে তার ব্যবহৃত ‘ডায়াং রানার’ মোটরসাইকেলসহ অপহরণ করে ১ নং বিবাদী সোহাগের বাড়িতে নিয়ে যায়।
সেখানে তাকে আটকে রেখে প্রথম দফায় বেধড়ক মারপিট ও জখম করা হয়। এরপর তাকে আরও নির্যাতনের জন্য স্থানীয় উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান এবাদুল হকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দলবল নিয়ে তার ওপর দ্বিতীয় দফায় মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হয়। ভুক্তভোগী হাফিজুর জানান, মারের চোট সহ্য করতে না পেরে তিনি ‘বাবা-মা’ বলে চিৎকার করে জীবন ভিক্ষা চাইলেও সন্ত্রাসীরা থামেনি। একপর্যায়ে জোরপূর্বক মারধরের মুখে তার কাছ থেকে একটি বানোয়াট ও সাজানো স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় এবং সন্ত্রাসী বাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে সেই স্বীকারোক্তির ভিডিও চিত্র মোবাইল ফোনে ধারণ করে রাখে।
ভুক্তভোগীর দাবি, পাওনা টাকার একটি বড় অংশ পূর্বেই পরিশোধ করার পরও সন্ত্রাসীরা তার কাছে থাকা নগদ ১ লক্ষ টাকা, মোটরসাইকেল এবং ২টি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। এরপর জোরপূর্বক মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে তাকে অস্ত্র প্রদর্শন করে জিম্মি অবস্থায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, কালীগঞ্জ শাখায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে চেকে সই করে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হতে থাকে এবং ব্যাংকের ভেতরেই নির্যাতন অব্যাহত রাখা হয়।
এদিকে হাফিজুরকে বাড়িতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তার মা সুফিয়া বেগম, বোন হাফিজা খাতুন (২৪) এবং ভাগ্নে ফিরোজ (২০) ব্যাংকে পৌঁছান। তারা হাফিজুরকে অবরুদ্ধ দেখে উদ্ধারের চেষ্টা করলে অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্র উঁচিয়ে তাদের ওপর চড়াও হয় এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। ভুক্তভোগীদের ধারণা, কালীগঞ্জ ইসলামী ব্যাংক শাখার আজকের সিসিটিভি ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করলে এই অপহরণ ও জিম্মি নাটকের সব সত্যতা এবং সন্ত্রাসীদের চেহারা স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসবে।
এদিকে একজন পেশাদার সাংবাদিকের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এমন নির্মম নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চলা এই সন্ত্রাসী বাহিনীর এহেন ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও সাধারণ জনগণ। অভিযুক্তদের দল ও সমাজ থেকে দ্রুত বহিষ্কার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় জনগণ। অবিলম্বে এই চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ কল করে বিষয়টি জানানো হয়। অভিযোগ পেয়ে কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেন এবং দ্রুত পুলিশের একটি চৌকস দল ঘটনাস্থলে পাঠান। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ সাংবাদিক হাফিজুর রহমানকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। বর্তমানে তিনি থানা হেফাজতে নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছেন।
এই বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, "৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে। বর্তমানে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি ও ভিডিও ধারণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।"
সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ মেহেদী হাসান,মোবাইল-০১৭৪৫-০৫৪৯৯৮
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত