মোঃ হাফিজুর রহমান হাফিজ, সাতক্ষীরা জেলা ক্রাইম রিপোর্টার।
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ১১ নং রতনপুর ইউনিয়নের মলাঙ্গা গ্রামে সুলতা সরদার (২৭) নামে দুই সন্তানের জননী এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।এটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যা-তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যৌতুকের চাপ,পারিবারিক নির্যাতন এবং স্বামীর কথিত পরকীয়ার জের ধরেই এই মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।জানা গেছে,গত মঙ্গলবার (৪ মার্চ ২০২৬) রাতে ছয় মাসের শিশু সন্তান রেখে গৃহবধূ সুলতার আত্মহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে প্রথমে তাকে অসুস্থ বলে জানানো হলেও কিছুক্ষণ পর পরিবারের কাছে তার মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছায়।
বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় সুলতার বাবা সুবোল বৈদ্য জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মরদেহ উদ্ধার করে।নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে কালিগঞ্জ উপজেলার মলাঙ্গা গ্রামের সত্যচরণ সরদারের ছেলে শশাঙ্ক সরদারের সঙ্গে শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের ভেটখালী গ্রামের দিনমজুর সুবোল বৈদ্যের মেয়ে সুলতার হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে হয়। বিয়ের সময় শশাঙ্কের পক্ষ থেকে একটি মোটরসাইকেল যৌতুক হিসেবে দাবি করা হয়। তখন কনের পরিবার সামর্থ্য অনুযায়ী স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র দিলেও মোটরসাইকেল পরে দেওয়ার আশ্বাস দেয়।পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই মোটরসাইকেলের দাবিকে কেন্দ্র করে সুলতার ওপর চাপ বাড়তে থাকে এবং বিভিন্ন সময় তার মাধ্যমে বাবার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। সংসারে তাদের দুই সন্তান—বড় ছেলে হিমেল সরদার (৬ বছর) ও ছোট ছেলে প্রিয় (৬ মাস)। কিন্তু যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সুলতার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চলছিল বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। এমনকি কয়েকবার শ্বশুর সত্যচরণ সরদার তাকে মারধর করে ঘরে আটকে রাখার ঘটনাও ঘটেছে বলে পরিবার দাবি করেছে।এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শশাঙ্ক সরদার একটি এনজিওতে ক্রেডিট অফিসার হিসেবে কর্মরত। একই প্রতিষ্ঠানের এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে বলে এলাকাবাসীর মধ্যে আলোচনা রয়েছে। বিষয়টি সুলতা জানতে পারার পর থেকেই তাদের দাম্পত্য জীবনে কলহ বাড়তে থাকে। এ নিয়ে প্রায়ই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হতো বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।ঘটনার পর সুলতার ঝুলন্ত মরদেহের কিছু ছবি দেখে স্থানীয়রা ও কয়েকজন চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সাধারণত ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে শরীরে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ দেখা যায়। কিন্তু ঘটনাস্থলে মৃতদেহের অবস্থান এবং পা মাটিতে স্পর্শ করা অবস্থায় থাকায় অনেকেই এটিকে রহস্যজনক বলে মনে করছেন।স্থানীয়দের অভিযোগ,সুলতাকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে প্রশাসনের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।তবে অভিযুক্ত স্বামী শশাঙ্ক সরদার দাবি করেছেন, ঘটনার সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন এবং কোনো ধরনের ঝগড়া বা মনোমালিন্য হয়নি।এ বিষয়ে কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জুয়েল হোসেন বলেন, “মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে।ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। যদি তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।এদিকে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তারা বলেন,একজন নিরীহ গৃহবধূর জীবন যদি নির্যাতন ও অবহেলায় ঝরে গিয়ে থাকে, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপই পারে এই রহস্যজনক মৃত্যুর প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং সমাজে এমন অপরাধের বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা দিতে।