নিজস্ব প্রতিবেদক,
খুলনার কয়রা উপজেলায় জমি দখলকে কেন্দ্র করে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু ও তার মায়ের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় তিন দিন পেরিয়ে গেলেও মামলা নেয়নি পুলিশ। উল্টো তদন্তের আগেই অভিযুক্তদের পক্ষ নিয়ে ঘটনাটিকে 'সাধারণ বিষয়' হিসেবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে কয়রা থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি তদন্ত) শাহ আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে, বিবাদীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করে এবং পুরনো ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সেবা বঞ্চিত করছেন তিনি।
সাধারণত কোনো মারপিটের ঘটনায় আঘাতের গভীরতা বুঝতে হাসপাতালের মেডিকেল সার্টিফিকেট (এমসি) প্রয়োজন হয়। কিন্তু কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন সোনিয়া খাতুনের মাথায় তিনটি সেলাই এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম থাকা সত্ত্বেও ওসি (তদন্ত) শাহ আলম একে ‘৩২৩ ধারার সাধারণ ঘটনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। হাসপাতাল থেকে এখনও এমসি রিপোর্ট না আসলেও পুলিশের এমন আগাম মন্তব্য ও মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানানোকে রহস্যজনক মনে করছেন স্থানীয়রা। ভুক্তভোগীদের দাবি, এসআই প্রণয় ও এএসআই আব্বাসউদ্দীনের মাধ্যমে বিবাদীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে পুলিশ মামলাটিকে জিডিতে রূপান্তর করতে চাইছে।
ঘটনার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এর আগে একই পরিবারের ওপর নির্যাতনের খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে এএসআই আব্বাসউদ্দীনকে থানা থেকে বদলি করা হয়েছিল। এএসআই আব্বাসউদ্দীন ওসি তদন্ত শাহ আলমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও 'একান্ত অফিসার' হিসেবে পরিচিত। নিজের বিশ্বস্ত সহকর্মীর বদলির পেছনে সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশ ও ভুক্তভোগীদের তৎপরতাকে দায়ী মনে করে চরম ক্ষোভ পোষণ করছেন ওসি শাহ আলম। ফলে এবারও হামলার শিকার হয়ে ভুক্তভোগী পরিবারটি যখন থানায় এজাহার জমা দিতে যায়, তখন ওসি মামলা না নিয়ে পুরনো সেই আক্রোশ দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, কয়রা থানায় বর্তমানে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। মামলা করতে হলে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা এবং মামলা গ্রহণে কালক্ষেপণ করা ওসির নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে। সোনিয়া খাতুনের পরিবার দরিদ্র হওয়ায় এবং পুলিশের দাবি করা টাকা দিতে না পারায় চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
বিচারের আশায় তিন দিন ধরে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করছেন ব্লাড ক্যান্সার ও থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু মীম ও তার মা সোনিয়া খাতুন। সোনিয়া বলেন, "আমরা গরিব বলে কি বিচার পাব না? পুলিশ বলছে মামলা হবে না। আমাদের বাচ্চাটা মরতে বসেছে, ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেছে—সব প্রমাণ দেওয়ার পরেও ওসি সাহেব বলছেন এটা নাকি মামুলি ঘটনা।" ভুক্তভোগী পরিবার ইতিমধ্যে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি এবং জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) হোয়াটসঅ্যাপে ঘটনার ছবি, ভিডিও এবং এজাহারের কপি পাঠিয়েছেন। পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ কামনা করে তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রভাবশালী ও পুলিশের যোগসাজশে তারা বর্তমানে চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছেন।
জনগণের প্রশ্ন: যেখানে একজন অসহায় মা ও অসুস্থ শিশুর রক্ত ঝরল, সেখানে হাসপাতালের এমসি আসার আগেই কোন ক্ষমতাবলে পুলিশ একে ‘সাধারণ ঘটনা’ বলার স্পর্ধা দেখায়? পুলিশের এমন অপেশাদার আচরণ ও ঘুষের রাজত্ব বন্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
উল্লেখ্য, গত ৫ মে বিকেলে জমি দখলের উদ্দেশ্যে বামিয়া গ্রামে সোনিয়া খাতুনের বাড়িতে হামলা চালায় প্রতিবেশী রফিকুল গাজী ও বিলাল গাজী গং। এসময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে সোনিয়ার মাথায় কোপ দেওয়া হয় এবং তার অসুস্থ শিশু সন্তানকে শ্লীলতাহানি ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়।