নিজস্ব প্রতিবেদক
আকাশে সামান্য মেঘের আনাগোনা কিংবা মৃদু বাতাস বয়ে গেলেই থমকে যায় বিদ্যুৎ সরবরাহ। কোনো কারণ ছাড়াই হুটহাট গায়েব হয়ে যায় আলো। একবার বিদ্যুৎ গেলে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার আগে তার দেখা মেলে না। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে রাতে শান্তিতে ঘুমানোর উপায় নেই, দুপুরে খাওয়ার পর একটু জিরিয়ে নেওয়ারও জো নেই। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন চরম রূপ নিয়েছে। বিদ্যুৎ নিয়ে এই অন্তহীন লুকোচুরিতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের জীবন এখন আক্ষরিক অর্থেই যন্ত্রণায় ভরে উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, ক্ষুব্ধ জনতা এখন পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও, মানববন্ধনসহ বিদ্যুৎ বিল বর্জন এবং সংশ্লিষ্টদের মারধরের মতো কঠোর কর্মসূচি ও হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
স্থানীয় গ্রাহকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ— আসর, মাগরিব ও এশারের আযান এবং নামাজের সময় নিয়ম করে বিদ্যুৎ চলে যায়। ধর্মীয় ইবাদতের সময় বারবার এভাবে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুসল্লিরা।
শ্যামনগর সদরসহ গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, রমজাননগর, কৈখালী, আটুলিয়া, ঈশ্বরীপুর, ভুরুলিয়া এবং কাশিমারীসহ উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের চিত্র একই। উপকূলবর্তী এই অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ থেকে শুরু করে সদরের ব্যবসায়ী— সবার জীবনই বিদ্যুতের কারণে ওষ্ঠাগত।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে থাকা কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে ডিজিটাল লেনদেন ও অফিশিয়াল কাজকর্ম। তীব্র গরমে একদিকে যেমন জনজীবন বিপর্যস্ত, অন্যদিকে স্থবির হয়ে পড়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
গ্রাহকদের অভিযোগের তীর শুধু লোডশেডিংয়ের দিকেই নয়; পল্লী বিদ্যুতের বিরুদ্ধে রয়েছে 'ভুতুড়ে বিল'-এর গুরুতর অভিযোগ। অনেক গ্রাহকের দাবি, বাড়িতে মিটার না চললেও বা স্বাভাবিকের চেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও মাসের শেষে আকাশচুম্বী বিল পাঠানো হচ্ছে। এই সমস্যা নিয়ে দিনের পর দিন পাটকেলঘাটা হেড অফিস ও স্থানীয় জোনাল অফিসে ঘুরেও কোনো প্রতিকার মিলছে না।
সবচেয়ে বড় বিপত্তি বাঁধে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর। স্থানীয়রা জানান, পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের অফিশিয়াল ও জরুরি যোগাযোগের নম্বরগুলোতে একাধিকবার কল দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ফোন রিসিভ করেন না, অনেক সময় কল কেটে দেওয়া হয়। ফলে বিভ্রাটের সঠিক কারণ বা কখন বিদ্যুৎ আসবে, তা জানার কোনো উপায় থাকে না সাধারণ মানুষের।
শ্যামনগরের এই চরম বিদ্যুৎ সংকটে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল সাতক্ষীরা-৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলাম, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ মন্ত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, অনতিবিলম্বে এই অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে একটি সুস্থ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শ্যামনগর পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের অনিয়ম দূর করা হোক এবং উপকূলীয় এই অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা ফিরিয়ে দেওয়া হোক। অন্যথায় যেকোনো সময় গ্রাহকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে বড় ধরনের গণআন্দোলন বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
(এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শ্যামনগর পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।)